ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সিলেট বিভাগের ১৯টি সংসদীয় আসনে ভোটের সমীকরণ এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। মাঠে প্রচার জোরদার হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে অস্বস্তি বিরাজ করছে। বিএনপি অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও বিদ্রোহী প্রার্থীর চাপে তটস্থ। জামায়াতে ইসলামী নিজেদের তুলনামূলক শক্তিশালী প্রার্থীদের সরিয়ে জোটের শরিকদের প্রার্থী করায় সেসব আসনের প্রার্থীদের বিজয় নিয়ে রয়েছে টেনশন। দুটি প্রধান দলই ‘এক বক্স’ নীতি বাস্তবায়নে মরিয়া হলেও এখনো সম্ভাবনার আলো ছুঁতে পারেনি কোনো জোটই। ফলে ভোটযুদ্ধে থাকা দুপক্ষেই নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে ততই অস্বস্তি বাড়ছে। সিলেট বিভাগে ভোটের সমীকরণ এখনো মেলাতে পারেনি বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন দুটি জোট। ভোটার উপস্থিতি, বিএনপির ঘর সামলানোর সক্ষমতা এবং জামায়াতের জোট ব্যবস্থাপনা, বাড়ি-বাড়ি নারী কর্মীদের অব্যাহত প্রচারণা-এই চারটি বিষয়ই ফল নির্ধারণে মুখ্য হয়ে উঠতে পারে।
সাধারণ ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পক্ষে। কে জিতবে সেটা বড় কথা নয়, শান্তিপূর্ণ ভোটের জন্য শান্তিপূর্ণ পরিবেশ-এটাই তাদের প্রত্যাশা। ভোটারদের এমন মনোভাবই ভোটের সমীকরণকে অনেকটা অনিশ্চিত করে দিচ্ছে। কারণ ভোটার উপস্থিতি বেশি বা কমের মধ্যেও রয়েছে ভোটে জয়-পরাজয়ের অনেক হিসাব-নিকাশ। সিলেটের প্রেক্ষাপট ও এমন পরিস্থিতির কথা অনেকটাই হয়তো আগাম আঁচ করতে পেরেছিলেন দুটি দলের হাইকমান্ড। যার ফলে নির্বাচনি প্রচারণা সিলেট থেকেই শুরু করে বিএনপি। আর বিএনপির সেই সমাবেশের পর এবার হেলিকপ্টারে উড়ে ঝটিকা সফরে সিলেট আসছেন জামায়াতের আমিরও।
রাজনৈতিক বাস্তবতায় সিলেট বিভাগের বেশির ভাগ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপির ধানের শীষ ও জামায়াতের দাঁড়িপাল্লার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
তবে এই সরল সমীকরণের আড়ালে জটিল বাস্তবতা রয়েছে। বিএনপির জন্য বড় সমস্যা দলের ভেতরের বিভাজন। সিলেট-৩, সিলেট-৪, সিলেট-৫ ও সিলেট-৬ আসনে মনোনয়ন ঘিরে অসন্তোষ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। কোথাও বিদ্রোহী প্রার্থী, কোথাও নীরব বিরোধিতা দলীয় প্রার্থীর ভোট কমাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় নেতারা।
সিলেট-৩ আসনে বিএনপির প্রবাস ফেরত প্রার্থীকে ঘিরে ঐক্যের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। সিলেট-৫ আসন জোটের শরিককে ছেড়ে দেওয়ায় বিএনপির তৃণমূল ক্ষুব্ধ। বহিষ্কার সত্ত্বেও বিদ্রোহী প্রার্থীকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে দ্বিধাবিভক্তি তৈরি হয়েছে। সিলেট-৬ আসনে পুরোনো শক্ত প্রার্থীর অনুসারীদের পুরোপুরি মাঠে নামানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
এই চিত্র আরও জটিল হয়ে উঠেছে সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলায়। সুনামগঞ্জের পাঁচটি আসনের মধ্যে তিনটিতে দ্বিমুখী ও ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় বিএনপির ভোট ভাগ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হবিগঞ্জ-১ আসনে নতুন প্রার্থীকে ঘিরে পুরোনো নেতাদের অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে। মৌলভীবাজার-৪ আসনে বহিষ্কৃত নেতার নিজস্ব ভোটব্যাংক বিএনপির জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থানও স্বস্তিদায়ক নয়। অতীতে সিলেট বিভাগে বড় সাফল্য না পেলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাংগঠনিকভাবে শক্তি বাড়িয়েছে দলটি। তবে জোটের বাস্তবতায় অনেক সম্ভাবনাময় আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না জামায়াত। ১৯টি আসনের মধ্যে ১০টি জোটের শরিকদের ছেড়ে দিতে হয়েছে। এতে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ রয়েছে।
সিলেট-৩ ও হবিগঞ্জ-১ আসনে শেষ মুহূর্তে প্রার্থী প্রত্যাহার জামায়াতের কর্মীদের মনোবলে প্রভাব ফেলেছে। তারা জোটের সিদ্ধান্ত মেনে প্রচারে থাকলেও ভোটারদের কতটা উজ্জীবিত করতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় আছে। আবার সিলেট-৪ ও সিলেট-৬ আসনে জামায়াত শক্ত অবস্থানে থাকলেও বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থীর কারণে লড়াই কঠিন হয়ে উঠেছে।
এই দুই দলের হিসাবকে আরও জটিল করে তুলেছে আওয়ামী লীগপন্থি ভোটারদের ভূমিকা। প্রকাশ্যে মাঠে না থাকলেও এই ভোট কোনদিকে যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার আসনগুলোতে এই ভোটই শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয়ের ফারাক গড়ে দিতে পারে।
তবে এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও দুই দলই কৌশলগতভাবে সক্রিয়। বিএনপি কেন্দ্র থেকে ঐক্যের বার্তা দিচ্ছে। দফায় দফায় বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে প্রভাবশালী নেতা ও তাদের অনুসারী বলয়কে সিরিয়াস করে তোলা হচ্ছে। সিলেট-৪ আসন রেখে সিলেট-১ আসনে ধানের শীষের মর্যাদা রক্ষায় প্রচারণায় নেমেছেন সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা সিলেট-৩ আসনে ধানের শীষ উদ্ধার নিশ্চিতে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘রুস্তমের’ মতো প্রবীণ রাজনীতিক, কয়েকবারের এমপি, শিল্পপতি শফি আহমদ চৌধুরীর বহিষ্কারাদেশ বৃহস্পতিবার প্রত্যাহার করে নির্বাচনি প্রচারণার স্রোতে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। নিজের আসন রেখে এ আসনের প্রচারণায় নামানো হয়েছে নিখোঁজ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদী লুনাকে। পাশাপাশি জেলা ও থানা পর্যায়ে বৈঠক করে বিদ্রোহী ও ক্ষুব্ধ অংশকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। প্রবাসী ভোটার ও তরুণদের কাছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বার্তা তুলে ধরা হচ্ছে।
জামায়াত নিজেদের প্রার্থী ছাড়াও শরিকদের নির্বাচনি বৈতরণী পার করতে মরিয়া। শরিক দলগুলোর কর্মীদের সমন্বয়ে মাঠে নামানোর চেষ্টা চলছে। ধর্মীয় ও সামাজিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ভোটারদের কেন্দ্রমুখী করতে কাজ করছে তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার বাড়ানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সিলেট জেলা ও মহানগর জামায়াত দলের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সিলেট সফর উপলক্ষ্যে এক ব্রিফিংয়ে জানায়, শনিবার সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে নির্বাচনি জনসভা হবে। এ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখবেন ডা. শফিকুর রহমান। এছাড়া ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য রাখবেন। আজ শনিবার দুপুর ২টা থেকে শুরু হয়ে এ জনসভা শেষ হবে বিকাল সাড়ে ৪টায়।
প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, শনিবার হেলিকপ্টারযোগে জামায়াত আমির সকাল ১০টায় হবিগঞ্জে পৌঁছাবেন। সেখানে নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য দিয়ে বেলা সাড়ে ১১টায় মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় জনসভায় যোগ দেবেন। দুপুর ২টার দিকে হেলিকপ্টারযোগে সিলেট এসে পৌঁছাবেন তিনি।
তবে ভোট যত এগোচ্ছে, টেনশনও তত বাড়ছে। বিএনপি ও জামায়াত দুই পক্ষই বুঝতে পারছে, সামান্য বিচ্যুতিই সিলেটের ১৯টি আসনের ফল পুরোপুরি বদলে দিতে পারে। ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়লে কার লাভ, কার ক্ষতি এ নিয়েও চলছে নানা সমীকরণ।
সিলেট বিভাগে মোট ভোটার প্রায় ২৮ লাখ ৭০ হাজার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ নারী এবং নতুন ও তরুণ ভোটার। দুদলই তরুণ ভোটারদের কাছে টানতে দিচ্ছেন নানান প্রতিশ্রুতি।