যশোর প্রতিনিধি
বেনাপোল কাস্টমস হাউসে আমদানি পণ্য পরীক্ষণ ও শুল্কায়ন ঘিরে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কাস্টমস, বন্দর, আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের একটি অংশের যোগসাজশে ‘ম্যানেজ’ করে বিপুল পরিমাণ ঘোষণাবহির্ভূত ও অতিরিক্ত পণ্য খালাসের চেষ্টা চলছে। এতে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
সম্প্রতি আলোচিত কয়েকটি আমদানি চালান নিয়ে এমন অভিযোগ সামনে এসেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে কয়েকটি চালান লক করা হলেও পরবর্তী সময়ে যথাযথ পরীক্ষণ ছাড়াই সেগুলো খালাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সূত্র ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ,ঢাকার চকবাজারের টিএল ট্রেডিং-এর মালিক মোস্তাফিজুর রহমানের আমদানি করা ৬৮৭ প্যাকেজের একটি চালানে ঘোষিত আমদানি মূল্য দেখানো হয় ৪১ হাজার ৩০১ দশমিক ২০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫১ লাখ টাকা। তবে চালানটির প্রকৃত পণ্যের মূল্য ও পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
চালানটি বেনাপোল বন্দরের ৪২ নম্বর শেডে আনলোড করা হয়। এতে উচ্চ শুল্কের ইমিটেশন পণ্য রয়েছে বলে জানা গেছে। ঘোষণায় মোট ওজন দেখানো হয় ২৮ হাজার ২৬৮ কেজি এবং নিট ওজন ১৬ হাজার ৮৫৪ কেজি। এর মধ্যে ৫৭১ প্যাকেজ ইমিটেশন পণ্যের মোট ওজন দেখানো হয় ২৪ হাজার ৬৩ কেজি এবং নিট ওজন ১৪ হাজার ৫৫ কেজি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ওই গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে পরীক্ষণে চালানটিতে ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের অসঙ্গতি ধরা পড়ে। পরে কাস্টমসের শুল্ক গোয়েন্দারা চালানটি রাতে লক করলেও পরদিন অতিরিক্ত পণ্যের পরিমাণ নিয়ে দেওয়া প্রতিবেদনে প্রায় ২ হাজার ৪০ কেজি বেশি পণ্যের কথা উল্লেখ করা হয়। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রকৃত অতিরিক্ত পণ্যের পরিমাণ এর চেয়ে অনেক বেশি কমপক্ষে ছয় হাজার কেজি।
চালানটিতে ইমিটেশন পণ্যের টিআর ৭১ দশমিক ৪৩ শতাংশ দেখানো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, অন্যান্য কাস্টম হাউসে সাধারণত এ ধরনের পণ্যে তুলনামূলক কম টিআর দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে এত বেশি টিআর দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও তারা তদন্ত দাবি করেছেন।
পরীক্ষণ প্রতিবেদনে পণ্য মিসডিক্লারেশন এবং ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য থাকার কথা উল্লেখ করে কাস্টমস আইন অনুযায়ী ৩২ ধারা লঙ্ঘনের বিষয়টি উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এরপরও জরিমানা করে চালানটি খালাসের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে কাস্টমসের সহকারী কমিশনার তওফিকুর রহমানের নামও উঠে এসেছে। ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি,তার নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একটি টিম চালানটির সীমিতসংখ্যক প্যাকেজ পরীক্ষা করে খালাসের সুযোগ দিয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে বেনাপোল বন্দরের ৩৯ নম্বর শেডে ৩ হাজার ১৯০ প্যাকেজের আরেকটি চালান নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের লোকনাথ টেক্সটাইল থেকে ‘অ্যাসোর্টেড গুডস’ হিসেবে পাঠানো চালানটির আমদানিকারক যশোরের সেভ বিডি ট্রেড এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট হিসেবে ভূইয়া এন্টারপ্রাইজের নাম জানা গেছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রায় এক কোটি টাকার রাজস্ব দিয়ে পাঁচটি ট্রাকে অন্তত পাঁচ কোটি টাকার পণ্য খালাস করা হয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, ৩ হাজার ১৯০ প্যাকেজের মধ্যে মাত্র ১২ থেকে ১৫টি প্যাকেজ নামমাত্র পরীক্ষণের পর চালানটি খালাসের অনুমতি দেওয়া হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ব্যবসায়ীরা।
অন্যদিকে, গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে বন্দরের ১২ নম্বর শেডে ‘ভাই ভাই সিন্ডিকেট’-এর একটি চালান লক করা হয়েছে বলে জানা গেছে। চালানটির আমদানিকারক ঢাকার সালমান ইন্টারপ্রাইজ এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্যারেন্টস ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস সেন্টার। প্রতিষ্ঠানটির মালিক এসএম আজিজুর রহমান লিটু। একই এজেন্টের মাধ্যমে বেনাপোল বন্দরে আরও কয়েকটি চালান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
২৫ আগস্টের একটি চালানের ম্যানিফেস্ট নম্বর ৬০১২০২৬০০১০০৫১৭৪৪ বলে জানা গেছে। পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁর মা ইন্টারপ্রাইজ থেকে পাঠানো ওই চালানের আমদানিকারক ঢাকার তামান্না করপোরেশন। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এসব চালানে ঘোষণার অতিরিক্ত ও ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া ৩১ আগস্ট বন্দরের ১৫ নম্বর শেডে ওই গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে কাস্টমস ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা অভিযান চালালে ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। শেড ইনচার্জ লিফাত হোসেনের দাবি, সেখানে মাত্র ছয়টি ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য পাওয়া গেছে। তবে পণ্যগুলোর মালিকানা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ,বেনাপোল কাস্টমসে চালান পরীক্ষণে দীর্ঘসূত্রতা ও অনিয়মের কারণে একদিকে সৎ ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন,অন্যদিকে প্রভাবশালী একটি চক্র শুল্ক ফাঁকির সুযোগ পাচ্ছে। কোনো কোনো চালান এক সপ্তাহের বেশি সময় শেডে পড়ে থাকলেও কাস্টমস কর্মকর্তারা যথাযথ পরীক্ষণের জন্য যাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ তাদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কয়েকটি চালানে অস্বাভাবিক কম মূল্য ঘোষণা করে বিপুল পরিমাণ পণ্য আনার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় সঠিকভাবে পণ্য পরীক্ষা, মূল্যায়ন ও শুল্ক নির্ধারণ করা হলে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায় সম্ভব বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
তাদের অভিযোগ,কাস্টমসের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারকদের একটি অংশ রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ নিচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ অবস্থায় বেনাপোল কাস্টমসে সন্দেহজনক চালানগুলো পুনরায় পরীক্ষা, আমদানি পণ্যের প্রকৃত মূল্য যাচাই এবং ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের মিল না থাকলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সৎ ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে অভিযোগগুলো তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, কাস্টমসের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব প্রতিষ্ঠানে যদি অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তাহলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন জরুরি। তদন্তেই নির্ধারিত হতে পারে—কোথায় পণ্য ঘোষণায় গরমিল হয়েছে, কতটুকু রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা হয়েছে এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত।