যশোর অফিস
যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার দরাজহাট ইউনিয়নে ভৈরব নদের তীরে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী—ঐতিহ্যবাহী ছাতিয়ানতলা হাট। বিশাল এক বটগাছকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই হাটের বয়স দুই শতকেরও বেশি। সময়ের পরিবর্তনে আগের সেই জৌলুশ কিছুটা ম্লান হলেও, শতবর্ষের ঐতিহ্য বুকে নিয়ে আজও সপ্তাহে দুই দিন প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে ওঠে হাটটি।
যশোর-নড়াইল মহাসড়কের ছাতিয়ানতলা মোড় থেকে ভৈরব নদের তীর ঘেঁষে অবস্থিত এ হাটে প্রতি রোববার ও বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কেনাবেচা চলে। যশোর সদর, বাঘারপাড়া এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো মানুষ এখানে আসেন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, কৃষিপণ্য ও গ্রামীণ সামগ্রী কিনতে-বেচতে।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, একসময় ভৈরব নদ ছিল প্রমত্তা। মাদারীপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও নড়াইলসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা বড় বড় নৌকায় করে এসে এই হাট থেকে ধান, পাট, খেজুরের গুড়, পাটালি ও কাঁঠাল কিনে নিয়ে যেতেন। নদীর ঘাটজুড়ে সারি সারি নৌকার দৃশ্য ছিল এ হাটের অন্যতম আকর্ষণ।
৮২ বছর বয়সী সাইফুর মোল্লা বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি এই হাট দেখে আসছেন। তখন এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল ছাতিয়ানতলা হাট। একইভাবে ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মাটির তৈজসপত্র বিক্রি করা বীরেন কুমার পাল জানান, আগে হাটে মানুষের ঢল নামত, এখন লোকসমাগম কমলেও ঐতিহ্য এখনো অটুট।
চানাচুর বিক্রেতা গৌরচন্দ্র বিশ্বাস ও নাজিম উদ্দিনের মতো প্রবীণ ব্যবসায়ীরাও জানান, নদীপথের বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং আশপাশে নতুন নতুন হাট গড়ে ওঠায় আগের তুলনায় বেচাকেনা কমেছে। তবুও শতবর্ষী বটগাছের ছায়ায় বসা এই হাট এখনো এলাকার মানুষের আস্থা ও ঐতিহ্যের প্রতীক।
দরাজহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন বলেন, ব্রিটিশ আমলে ভৈরব নদের তীরে গড়ে ওঠা ছাতিয়ানতলা হাট একসময় পাট, গুড় ও মাছের বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত ছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ হাট স্থানীয় অর্থনীতি ও জনজীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
গ্রামীণ ঐতিহ্য, নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যের স্মৃতি এবং দুই শতকের ইতিহাস বুকে ধারণ করে ছাতিয়ানতলা হাট আজও যশোরের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী জনপদ হিসেবে নিজস্ব স্বকীয়তা ধরে রেখেছে।