আজ বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ২০২তম জন্মবার্ষিকী। ১৮২৪ সালের এই দিনে যশোরের কেশবপুর উপজেলার কপোতাক্ষ নদের তীরঘেঁষা সাগরদাঁড়ি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত দত্ত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। দুই শতাব্দী পেরিয়েও বাংলা সাহিত্যে তার অবদান আজও অম্লান, তিনি আজও সমান প্রাসঙ্গিক ও শ্রদ্ধার।
মধুসূদনের জন্মভূমি সাগরদাঁড়ি এখন কবি-সাহিত্যিকদের কাছে এক তীর্থভূমি। পাশাপাশি দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছেও এটি একটি আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক স্থান। প্রতিবছর প্রায় দেড় লক্ষাধিক দর্শনার্থী টিকিট কেটে মহাকবির স্মৃতিবিজড়িত এই স্থান পরিদর্শন করেন। তবে অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাবে সাগরদাঁড়ির মধুপল্লী এখনো পুরোপুরি পর্যটকবান্ধব হয়ে উঠতে পারেনি।
শৈশব থেকে বিশ্বসাহিত্যের পথে
মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাবা ছিলেন জমিদার রাজনারায়ণ দত্ত এবং মা জাহ্নবী দেবী। শৈশবে তিনি সাগরদাঁড়ির পাশের শেখপুরা গ্রামের মৌলভী খন্দকার মখমলের কাছে বাংলা ও ফার্সি ভাষায় শিক্ষা লাভ করেন। ১৮৩৩ সালে তিনি সাগরদাঁড়ি ছেড়ে কলকাতার খিদিরপুরে চলে যান। সেখানে লালবাজার গ্রামার স্কুলে ইংরেজি, ল্যাটিন ও হিব্রু ভাষা শিখে অল্প বয়সেই ভাষাজ্ঞানে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন।
১৮৩৭ সালে তিনি হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। ১৮৪২ সালে ইংরেজিতে ‘স্ত্রী শিক্ষা’ বিষয়ে প্রবন্ধ লিখে স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৮৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন, যার ফলে হিন্দু কলেজে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে না পেরে বিশপস কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি গ্রিক ও সংস্কৃত ভাষায় জ্ঞানার্জন করেন।
মাদ্রাজ পর্ব ও সাহিত্যচর্চার সূচনা
ভাগ্যান্বেষণে তিনি মাদ্রাজ (বর্তমান চেন্নাই) চলে যান। সেখানে শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা ও সম্পাদনার কাজের পাশাপাশি নিয়মিত সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন বিভিন্ন পত্রিকায়। এ সময় তিনি রেবেকা ম্যাকটাভিসকে বিয়ে করেন।
১৮৪৯ সালে তার ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ The Captive Lady প্রকাশিত হয়। ১৮৫৪ সালে তিনি The Spectator পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। একই সময়ে প্রকাশিত হয় তার পুস্তিকা Anglo-Saxon and the Hindu।
বাংলা সাহিত্যে নবযুগের সূচনা
১৮৫৮ সালে ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক রচনার মাধ্যমে তিনি বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। এরপর একে একে ‘পদ্মাবতী’, ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’ প্রকাশিত হয়। বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন তারই হাত ধরে।
১৮৬১ সালে প্রকাশিত হয় তার অমর কাব্য ‘মেঘনাদবধ কাব্য’, যা বাংলা সাহিত্যে মহাকাব্যের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এ কাব্যের জন্য তিনি ‘মহাকবি’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৮৬৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’, যেখানে বাংলা সনেটের সার্থক প্রয়োগ দেখা যায়।
জীবনাবসান ও অমরত্ব
পরবর্তীতে তিনি ইংল্যান্ডে গিয়ে ব্যারিস্টারি পড়েন এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৮৬৭ সালে দেশে ফিরে আসেন। জীবনের শেষ পর্বে আর্থিক ও ব্যক্তিগত সংকটে ভুগলেও সাহিত্যসাধনা থামাননি। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন এই মহাকবি ইহলোক ত্যাগ করেন।
কবিতীর্থ সাগরদাঁড়ি
যশোর শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে কপোতাক্ষ নদের পূর্ব তীরে অবস্থিত সাগরদাঁড়িতে কবির পৈতৃক বাড়ি ঘিরে গড়ে উঠেছে মধুপল্লী। এখানে রয়েছে কবির বাসভবন, কাচারিঘর, মন্দির ও আত্মীয়দের বাড়ি। জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে তার ব্যবহৃত আসবাব, হাতে লেখা চিঠি, খাট, সিন্দুক, চেয়ার, পারিবারিক ছবি ও বিদেশে অবস্থানকালের আলোকচিত্র।
দর্শনার্থীরা কবির স্মৃতিবিজড়িত বিদায় ঘাট ও কপোতাক্ষ নদের তীরে ঘুরে দেখেন, ছবি তোলেন। নতুন প্রজন্মের কাছে মধুসূদনকে পরিচিত করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এই স্মৃতি সংগ্রহশালা।
সাগরদাঁড়ি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাড়ি ও জাদুঘরের কাস্টডিয়ান মো. হাসানুজ্জামান জানান, বছরে দেড় লক্ষাধিক পর্যটক এখানে আসেন। অবকাঠামো উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়েছে। এ বছর বড় মেলা না হলেও জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে মহাকবির জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হচ্ছে।