ধাপে ধাপে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করতে যাচ্ছে সরকার

Share

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় মাঠপর্যায় থেকে সেনাবাহিনীকে ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী ৬ জুন থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে জুনের মধ্যেই শেষ হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী ৬ জুন থেকে সেনাসদস্যদের চূড়ান্ত প্রত্যাহার শুরু করা হবে। প্রথমে দূরবর্তী জেলাগুলো থেকে সেনাবাহিনীকে সরিয়ে নেওয়া হবে, এরপর পর্যায়ক্রমে বিভাগীয় শহর ও বড় জেলাগুলো থেকেও প্রত্যাহার সম্পন্ন করা হবে। জুন মাসের মধ্যেই মাঠপর্যায়ে থাকা সব সেনাসদস্যকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর মঙ্গলবার কোর কমিটি প্রথম বৈঠকে বসে। এর আগে ২১ এপ্রিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং করণীয় নির্ধারণে কমিটি পুনর্গঠন করা হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রায় আড়াই ঘণ্টার এই বৈঠকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, বিজিবির মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় সেনাবাহিনীর প্রত্যাহারের পাশাপাশি দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, চাঁদাবাজি, পুলিশের পোশাক পরিবর্তনসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়।

পটভূমিতে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন সহিংস হয়ে উঠলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকার কারফিউ জারি করে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে। ওই বছরের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর পুলিশ বাহিনী ভেঙে পড়ায় সেনাবাহিনী মাঠে থেকেই দায়িত্ব পালন করে। পরবর্তীকালে ১৭ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতাও প্রদান করে।

সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ২০২৪ সালের আগস্টেই জানিয়েছিলেন, সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যেতে চায় এবং পুলিশ পুরোপুরি পুনর্গঠিত হলে সদস্যরা নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরবেন। এরপর গত বছরের নভেম্বর থেকে ধীরে ধীরে কিছু সেনাসদস্যকে প্রত্যাহার শুরু হয়। তবে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তারা আবারও মাঠে দায়িত্ব পালন করেন।

সংসদ নির্বাচনের পর ১৬ ফেব্রুয়ারি সেনাপ্রধান পুনরায় বলেন, নবনির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাবে। বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ১৭ হাজার সেনাসদস্য মাঠপর্যায়ে দায়িত্বে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের কারণে সদস্যদের ক্লান্তি ও বিশ্রামের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় একাধিকবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছিল।

এমন প্রেক্ষাপটে সর্বশেষ কোর কমিটির বৈঠকে সেনাবাহিনীকে চূড়ান্তভাবে মাঠ থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। শিগগিরই এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানাবে।

বৈঠকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গ্রেপ্তার হওয়া সাংবাদিকদের বিষয়েও আলোচনা হয়। যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ নেই, তাদের জামিনে বাধা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের বিদেশ যাত্রায় হয়রানি না করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যারা আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পেয়েছিলেন, তাদের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকদের জন্য গণ্যমান্য দেওয়ার বিষয়েও সম্মতি দেওয়া হয়।

মাদকের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান আরও জোরদার এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। একইসঙ্গে সারা দেশে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দল-পরিচয় বিবেচনা না করে মামলা করা হবে।

বৈঠকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল নিয়েও আলোচনা হয়। সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের বিষয়েও আলোচনা হয়। পুলিশের আইজিপি খাকি প্যান্ট পরিবর্তনের প্রস্তাব দিলেও তা গৃহীত হয়নি। ফলে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নেভি ব্লু শার্ট ও খাকি প্যান্টই বহাল থাকছে।

Read more