ত্রিমুখী বৈশ্বিক চাপে জ্বালানি সংকট: লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন

Share

যশোর প্রতিনিধি 
দেশে বিদ্যমান জ্বালানি সংকট নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইল–ইরানের সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তার প্রভাব সরাসরি পড়ছে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহে। এতে করে সদ্য নির্বাচিত সরকার পড়েছে বহুমুখী চাপে।
জ্বালানি আমদানিতে বিঘ্ন ঘটায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা চালালেও পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে অফিস-আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং শপিংমলের সময়সূচি কমানোর মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে বৈশাখের শুরুতেই তীব্র গরমের সঙ্গে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি জনজীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ।
যশোর বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের এক প্রকৌশলী জানান, খুলনা অঞ্চলের ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে বর্তমানে ৬টিই বন্ধ রয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে জনজীবন ও শিল্প উৎপাদনে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা অঞ্চলের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট। তবে জ্বালানি সংকটের কারণে খুলনা ৩৩০ মেগাওয়াট, ফরিদপুর ৫০ মেগাওয়াট, নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানির ২২৫ মেগাওয়াট, মধুমতি ১০০ মেগাওয়াট এবং রূপসা ১০৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রসহ মোট ৬টি কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে।
খুলনা ৩৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর মাহফুজুর রহমান বলেন, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে কেন্দ্র চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। “আমাদের হাতে জ্বালানি নেই। জ্বালানি পেলে আমরা উৎপাদনে যেতে প্রস্তুত,” বলেন তিনি।
অন্যদিকে, কয়লাভিত্তিক রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু থাকলেও তা পুরো অঞ্চলের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়।
গ্রীষ্ম মৌসুমে খুলনা অঞ্চলে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ ঘাটতির কারণে প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকিরুজ্জামান বলেন, সীমিত সরবরাহের কারণে বাধ্য হয়েই লোডশেডিং করতে হচ্ছে। একইসঙ্গে বিদ্যুতের অপচয় রোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শপিংমলগুলোকে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ রাখারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতার মূল কারণ ইরান–ইসরাইল–যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা। হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে।
‘প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম (ফেড)’ জানায়, বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির ৬৮-৭৫ শতাংশ এবং অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই রুটে কোনো বিঘ্ন ঘটলেই জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।
এর অর্থনৈতিক প্রভাবও গুরুতর। গ্যাস ও তেলের ঘাটতির কারণে দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকছে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ, যা শ্রমবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফার্নেস অয়েলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ ১৮ টাকার বেশি হলেও সৌরবিদ্যুতে তা প্রায় অর্ধেক, প্রায় ৯ টাকা।
এ পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, দেশের ৪ কোটির বেশি পরিবারের ছাদ ব্যবহার করে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
তারা আরও বলেন, সৌর সেচ ব্যবস্থা চালু করা গেলে কৃষিখাতে বিপুল পরিমাণ ব্যয় সাশ্রয় সম্ভব। এজন্য সৌর সরঞ্জামে শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার, বাড়িভিত্তিক সৌর প্যানেলে ভর্তুকি এবং দ্রুত সৌর পার্ক অনুমোদনের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, এখনই নীতিগত পরিবর্তন না আনলে ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হবে এবং তা দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।
তবে সাধারণ মানুষ বলছেন এসি গুলাতে অনেক বিদ্যুৎ খরচ হয় দেশের এই সংকট মুহূর্তে সরকারি বেসরকারি অফিস আদালত এবং বাসা বাড়িতে এসিগুলো বন্ধ রাখা হলে প্রচুর পরিমাণ বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। তাতে হয়তো লোডশেডিং কিছুটা হইলেও কমবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।

Read more