রমনা বটমূলে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ ও শান্তি-কল্যাণ-স্বস্তির আকাঙ্ক্ষা ছায়ানটের

Share

রাজধানীর রমনা বটমূলে শেষ হয়েছে ছায়ানটের বর্ষবরণ ১৪৩৩-এর অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সম্পর্কিত সাম্প্রতিক ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে পারস্য অঞ্চলসহ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে শান্তি, কল্যাণ ও স্বস্তির আকাঙ্ক্ষাও ছিল ছায়ানটের আয়োজনে।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিনে সকাল ৮টা ২০ মিনিটে ছায়ানটের শিল্পীদের সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে এবারের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শেষ হয়।

অনুষ্ঠান শেষের আগে ছায়ানটের নির্বাহী সভাপতি ড. সারওয়ার আলী বক্তব্যে বলেন, সমাজে দিন দিন বাড়ছে অসহিষ্ণুতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় সৃষ্টি হচ্ছে নানা প্রতিবন্ধকতা। এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে নতুন বছরের শুরুতে শান্তি, নিরাপত্তা ও সহনশীলতার প্রত্যাশা সকলের।

একই সঙ্গে বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সম্পর্কিত সাম্প্রতিক ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে পারস্য অঞ্চলসহ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান সংঘাত ও নিপীড়ন বিশ্বজুড়ে এক ধরনের আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে।

এর প্রভাব পড়ছে দেশের ভেতরেও, যেখানে ভিন্নমত প্রকাশে অনেকেই নিজেদের অনিরাপদ বোধ করছেন। মতপ্রকাশের ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়া এবং সামাজিক সহনশীলতার অবক্ষয় একটি সুস্থ সমাজের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় বাংলা নববর্ষকে সামনে রেখে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ শান্তি, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নতুন বছর হোক ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মুক্তচিন্তার বিকাশের প্রতীক। যেখানে মানুষ নির্ভয়ে গান গাইতে পারবে, মত প্রকাশ করতে পারবে এবং নিরাপদ জীবনযাপন নিশ্চিত হবে। শুভ নববর্ষ।
এর আগে সূর্যোদয়ের পরপর শুরু হয় বর্ষবরণের ছায়ানটের অনুষ্ঠান। এবারের বার্তা, ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’—সেখানেই বাঙালির জয়। ছায়ানটের ৫৯তম অনুষ্ঠান সাজানো হয়েছে সকালের স্নিগ্ধ প্রকৃতি এবং মানব ও দেশপ্রেমের গানের পাশাপাশি লোকজনজীবনের সুর দিয়ে। সব মিলিয়ে বাঙালি সমাজকে বিগত বছরের সব ‘প্রতিকূলতা, আবর্জনা’ দূর করে নতুন বছরে ‘আরও মানবমুখী’ হওয়ার প্রত্যয়। সময় যত গড়িয়েছে, বেলা যত বেড়েছে ততই ভিড় বাড়তে দেখা গেছে অনুষ্ঠানস্থলে।

এদিন নতুন বছরকে বরণ করতে আয়োজনের কমতি ছিল না রমনার বটমূলে। বাঙালি সংস্কৃতিকে লালন করে ঐতিহ্যগতভাবে বর্ষবরণের আয়োজন করে আসছে ছায়ানট। নতুন বছরকে তাই বরণ করে নেওয়া হয় সুরের মূর্ছনায়।

মঙ্গলবার সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে সম্মেলক কণ্ঠে ‘জাগো আলোক-লগ্নে’ গানের মাধ্যমে শুরু হয় ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। এর পরপরই পরিবেশিত হয় ‘এ কী সুগন্ধহিল্লোল বহিল’ ও ‘তোমার হাতের রাখীখানি বাঁধো আমার দখিন-হাতে’ গান দুটি। এরপর একের পর এক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন সাঁইয়ের গান, লোকগানের পাশাপাশি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অজয় ভট্টাচার্য, আবদুল লতিফ, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের গান পরিবেশন করা হয়।

এবারের অনুষ্ঠানে বিশেষ সংযোজন ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রখ্যাত গণসংগীতজ্ঞ সলিল চৌধুরীর জন্মশতবর্ষ এবং প্রয়াত বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, গীতিকার, সুরকার ও চিত্রশিল্পী মতলুব আলীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁদের গান। মোট ২২টি গান পরিবেশিত হয় প্রায় দুই ঘণ্টার এ অনুষ্ঠানে। এর মধ্যে ৮টি ছিল সম্মেলক গান, আর একক কণ্ঠের গান ছিল ১৪টি। পাঠ ছিল দুটি। ছায়ানটের শিশু বিভাগের শিক্ষার্থীসহ সব বিভাগের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিশিষ্ট শিল্পী মিলিয়ে প্রায় ২০০ শিল্পী অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

এদিকে ভোর থেকেই রমনায় বৈশাখী সাজে হাজির হন শিশু, নারী ও পুরুষ। সবারই প্রত্যাশা—বিগত বছরের সব গ্লানি মুছে নতুনের আবহে শুরু হোক বছরটি। বিভেদ ভুলে সাম্য আর ঐক্যের বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় সবার।

জানা গেছে, বরাবরের মতোই সংস্কৃতিবিরোধী অপশক্তিকে তুচ্ছ করে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে বাঙালি তার সর্ববৃহৎ উৎসব নতুন বছর বরণে ভয়কে জয় করার প্রত্যয় নিয়ে বাংলা নতুন বছরের ভোরে কণ্ঠ ছেড়ে গান গেয়েছে ছায়ানট। এবার মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধবাজরা হাজার হাজার বছরের পারস্য সভ্যতার ধ্বংসযজ্ঞে মত্ত-বিশ্ব জনজীবন যখন বিপর্যয়ের মুখে, তখন শান্তি, কল্যাণ ও স্বস্তির আকাঙ্ক্ষাও ছিল ছায়ানটের আয়োজনে।

দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংস্থা ছায়ানট ১৯৬৭ সাল থেকে রমনার এই বটমূলে পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছে। সে বছর রমনার বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনে নববর্ষ বরণের প্রভাতি অনুষ্ঠানের প্রধান বৈশিষ্ট্যই ছিল ভয়ের পরিবেশ থেকে বের হয়ে এসে সংগীতের ভেতর দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয়কে তুলে ধরা। পয়লা বৈশাখের এ অনুষ্ঠান কালক্রমে দেশের সব ধর্ম, বর্ণের মানুষের কাছে এক অভিন্ন উৎসবে পরিণত হয়েছে। এবারও ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে বরণ করা হলো রমনার এই বটমূল থেকেই।

১৯৬৭ সালে শুরু হওয়া এ উৎসব ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বছর ছাড়া প্রতিটি পহেলা বৈশাখে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়েছে সুরের মূর্ছনা আর কথামালায়। কোভিডের দুই বছর এ আয়োজন হয় ভার্চু্যয়ালি। ২০০১ সালে ছায়ানটের বৈশাখ বরণের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হয়। তাতে ১০ জন নিহত হন। এরপর থেকে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে প্রতিবছর বর্ষবরণের এ আয়োজন চলছে।

বর্ষবরণের আয়োজন ঘিরে পুরো রমনা পার্ক এলাকা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়। বসানো হয় ডিএমপি ও র‍্যাবের কন্ট্রোল রুম। প্রবেশপথ ও বাহিরপথ আলাদা করা হয়।

Read more