সিরিয়ায় সাবসিডিয়ারি কোম্পানির মাধ্যমে ‘জিহাদি’ সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) ও আল-কায়েদার সহযোগী সংগঠনের জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অর্থায়ন করত ফরাসি সিমেন্ট জায়ান্ট লাফার্জ। এর দায়ে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে ১৩ লাখ ডলার জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া লাফার্জের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ৮ সাবেক কর্মীকেও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সাবেক প্রধান নির্বাহী ব্রুনো লাফোঁকে ৬ বছরের কারাদণ্ড ও সাবেক ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ক্রিশ্চিয়ান হেরোকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) ফ্রান্সের প্যারিসের একটি আদালত এ রায় ঘোষণা করেন।
আদালতে লাফার্জ সিরিয়া ২০১৩-১৪ সালে ‘প্রটেকশন মানি’ হিসেবে এসব ‘জিহাদি’ সংগঠনকে ৬৫ লাখ ডলারের বেশি অর্থ দেওয়া প্রমাণিত হয়।
রয়টার্স ও এএফপির তথ্যমতে, ২০১৫ সালে লাফার্জকে আত্মীকরণ করে নেয় সুইজারল্যান্ডের সিমেন্ট জায়ান্ট হোলসিম। আদালতে রায়ের পর হোলসিম জানায়, তারা সিরিয়ায় লাফার্জের এ ধরনের কার্যক্রম সম্পর্কে কিছুই জানত না।
আদালতের রায়ে বলা হয়, সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলাকালে উত্তরাঞ্চলের একটি কারখানা সচল রাখতে ‘প্রটেকশন মানি’ হিসেবে লাফার্জ এসব অর্থায়ন করে। ২০১৩-১৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তারা প্রায় ৬৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার বিভিন্ন ‘জিহাদি’ গোষ্ঠীকে দেয়। এসব সংগঠনের মধ্যে আইএস ছাড়াও ছিল আল-কায়েদার সহযোগী আল-নুসরা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এসব সংগঠনকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
মামলার প্রধান বিচারক ইসাবেল প্রেভো-দেসপ্রেজ বলেন, ‘লাফার্জের এ অর্থায়ন জিহাদি গোষ্ঠীগুলোকে শক্তিশালী করেছে, যারা সিরিয়া ও এর বাইরেও প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে। আদালতের কাছে স্পষ্ট, সিরিয়ার কারখানাটি চালু রাখা ছিল সন্ত্রাসী সংগঠনকে অর্থায়নের একমাত্র উদ্দেশ্য। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ দেওয়ার মাধ্যমে লাফার্জ তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পেরেছে। এ অর্থায়ন কার্যত ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে একটি বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বে রূপ নিয়েছিল। জিহাদি সংগঠনগুলোকে দেওয়া এসব অর্থ সবসময় অপ্রকাশ্য থেকে গেছে, যা অপরাধের মাত্রা বাড়িয়েছে।’
২০০৮ সালে উত্তর সিরিয়ার জালাবিয়া এলাকায় অবস্থিত লাফার্জের কারখানাটি ৬৮ কোটি ডলারে কেনা হয়। কারখানাটি উৎপাদন শুরু করে ২০১০ সালে। এর কয়েক মাস পর ২০১১ সালের মার্চে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন শুরু হয়, যা একপর্যায়ে গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।
ফরাসি গণমাধ্যম লে মন্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে আইএস সিরিয়া ও প্রতিবেশী ইরাকের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে তথাকথিত ‘খিলাফত’ ঘোষণা করে এবং কঠোর শরিয়াভিত্তিক শাসন চালু করে। এ অবস্থায় অন্য বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ২০১২ সালের মধ্যেই সিরিয়া ছেড়ে গেলেও লাফার্জ শুধু বিদেশি কর্মীদের সরিয়ে নেয়। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে আইএস কারখানাটির নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আগ পর্যন্ত তারা স্থানীয় সিরীয় কর্মীদের কাজে নিয়োজিত রাখে।
প্রসিকিউটররা আদালতকে জানান, ২০১৩-১৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব অর্থায়ন করা হয়। ওই সময় লাফার্জের কর্মীরা নিকটবর্তী মানবিজ শহরে থাকতেন। কারখানায় যেতে তাদের ইউফ্রেটিস নদী পার হতে হতো। নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ৯ লাখ ডলারের বেশি অর্থ দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া আইএস নিয়ন্ত্রিত খনি থেকে কাঁচামাল কিনতে আরও ১৮ লাখ ডলার ব্যয় করা হয়।
এ মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন, লাফার্জের সাবেক প্রধান নির্বাহী ব্রুনো লাফোঁ, সাবেক ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ক্রিশ্চিয়ান হেরো, অপারেশন ও নিরাপত্তা বিভাগের কয়েকজন সাবেক সদস্য ও দুজন সিরীয় মধ্যস্থতাকারী। আদালত লাফার্জ ছাড়াও আট সাবেক কর্মীকে সন্ত্রাসে অর্থায়নের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন।
ফ্রান্সের জাতীয় সন্ত্রাসবাদবিরোধী প্রসিকিউটর দপ্তর (পিএনএটি) ডিসেম্বরের শুনানিতে জানায়, কেবল মুনাফা অর্জনের জন্যই লাফার্জ এসব জিহাদি সংগঠনকে অর্থায়ন করেছে। সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত গোষ্ঠীগুলোকে অন্তত ৫৫ লাখ ডলার দেওয়া হয়েছে লাফার্জের পক্ষ থেকে।
প্রসিকিউটররা লাফার্জের জরিমানা ও সম্পদ জব্দের দাবির পাশাপাশি ব্রুনো লাফোঁর জন্য ছয় বছরের কারাদণ্ডও চেয়েছেন। লাফোঁ অবশ্য অবৈধ এসব অর্থায়নের বিষয়ে কিছু জানতেন না বলে দাবি করেছেন। তবে প্রসিকিউটরদের ভাষ্য, ৬৯ বছর বয়সী লাফোঁ কারখানা চালু রাখার জন্য ‘স্পষ্ট নির্দেশনা’ দিয়েছিলেন, যা তার ‘চরম নৈতিকতাবর্জিত’ সিদ্ধান্ত ছিল বলে বর্ণনা করেছেন প্রসিকিউটররা।
বিচার চলাকালে ক্রিশ্চিয়ান হেরো বলেন, ‘কারখানাটি চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল স্থানীয় কর্মীদের কথা বিবেচনা করে। আমরা চাইলে সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে পারতাম। কিন্তু তাহলে কর্মীদের কী হতো?’
এটি ফ্রান্সে প্রথমবারের মতো কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদে অর্থায়নের অভিযোগে বিচার হওয়া মামলা। তবে এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে পৃথক একটি মামলায় লাফার্জ ২০২২ সালে সিরিয়ার ‘জিহাদি’ সংগঠনগুলোকে অর্থায়নের কথা স্বীকার করে।
লাফার্জ জানায়, তাদের সিরীয় সাবসিডিয়ারি কোম্পানির মাধ্যমে আইএস ও নুসরা ফ্রন্টকে প্রায় ৬০ লাখ ডলার দেওয়া হয়, যেন তাদের কর্মী-গ্রাহক ও সরবরাহকারীরা সংঘাত শুরুর পর বিভিন্ন চেকপয়েন্ট অতিক্রম করতে পারে। ওই মামলায় সমঝোতার অংশ হিসেবে লাফার্জ ৭৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার জরিমানা ও বাজেয়াপ্ত অর্থ পরিশোধ করে।