বেনাপোল স্থল বন্দরে শুল্ক ফাঁকির ঘটনা প্রথম নয় মাসে ঘাটতির পরিমান ১৮শ’ কোটি টাকা

Share

যশোর অফিস 
দেশের বৃহত্তম স্থল বন্দর বেনাপোলে রাজস্ব ঘাটতি দিন দিন বাড়ছে। মিথ্যা ঘোষণা, ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আমদানি এবং শুল্ক ফাঁকির এক বিস্তৃত চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠায় ঘাটতি বাড়ছে রাজস্বের। বন্দর হারাচ্ছে তার সুনাম। আর এই শুল্ক ফাঁকি চক্রের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বন্দরের শীর্ষ প্রশাসনসহ কয়েকজন শেড ইনচার্জ। তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে নিম্ন শুল্কের পণ্যের আড়ালে উচ্চ শুল্কের পণ্য নিয়মিতভাবে খালাস হচ্ছে, ফলে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।
বেনাপোল কাস্টমস সুত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই বেনাপোল কাস্টমস হাউজে প্রায় ১ হাজার ৮শ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। যদিও এই সময়ে আমদানি কমেনি, বরং উচ্চমূল্যের পণ্যের আমদানি বেড়েছে। পণ্যের মূল্য কম দেখানো,মিথ্যা ঘোষণা এবং ঘুষের মাধ্যমে শুল্ক কমিয়ে দেওয়ার কারণেই এই বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী ও সিএন্ডএফ এজেন্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারত থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাক বন্দরে প্রবেশের পর নির্ধারিত শেডে কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের কঠোর তদারকির কথা থাকলেও বাস্তবে সেই প্রক্রিয়া অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু শেডে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিয়ম লঙ্ঘন করে কম শুল্কের পণ্য দেখিয়ে উচ্চ শুল্কের পণ্য ছাড়পত্র দিচ্ছেন। এসব ক্ষেত্রে মোটা অংকের ঘুষ লেনদেন হচ্ছে এবং মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টার মধ্যেই দ্রুত খালাস সম্পন্ন করা হচ্ছে, যা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
আমদানি-রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীদের একাংশ সরাসরি কয়েকজন শেড ইনচার্জের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, ৩৭ নম্বর শেডের ইনচার্জ নুর উদ্দিন লিংকন, ১৫ নম্বর শেডের সন্দ্বীপ, ৪১ নম্বর শেডের রুহুল আমিন, ২৭ নম্বর শেডের কে এম নাহিদুজ্জামান এবং সহকারী শেড ইনচার্জ ইউসুফ হোসেন দীর্ঘদিন ধরে এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত। তাদের মাধ্যমেই ঘোষণার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পণ্য বন্দরে প্রবেশ করছে এবং বিপুল অংকের শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ আরও রয়েছে, প্রশাসনিক নির্দেশ অমান্য করে কিছু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একই বন্দরে বহাল রয়েছেন। সহকারী শেড ইনচার্জ ইউসুফ হোসেনকে ২০২৫ সালে অন্যত্র বদলি করা হলেও তিনি এখনো বেনাপোলে দায়িত্ব পালন করছেন। একইভাবে বন্দর পরিচালক শামীম হোসেনকেও অনত্র্য বদলি করা হলেও অজ্ঞাতকারনে সেই বদলির আদেশও কার্যকর হয়নি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে এবং জবাবদিহির অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় অনিয়মের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে। গত ১৪ মার্চ ‘ব্রেকিং পাউডার’ নামে নিম্ন শুল্কের পণ্য ঘোষণা দিয়ে আনা একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার করা হয় উচ্চ শুল্কের ভারতীয় শাড়ি, থ্রি-পিস, কসমেটিকস ও ওষুধ যার বাজারমূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা। এর আগে ৯ মার্চ ‘ঘাসের বীজ’ হিসেবে ঘোষিত একটি চালান থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকার নিষিদ্ধ পাট বীজ উদ্ধার করা হয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন,এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং সুসংগঠিত অনিয়মের ধারাবাহিক উদাহরণ।
এছাড়া গত ১৮ জানুয়ারি তিনটি ট্রাকে ৫৬ মেট্রিক টন মোটরপার্টস আমদানির ঘোষণা দেওয়া হলেও পরীক্ষায় ঘোষণার বাইরে অতিরিক্ত প্রায় তিন মেট্রিক টন পণ্য পাওয়া যায়। এতে অতিরিক্ত ২৮ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করা হয়। প্রশ্ন উঠেছে, এসব অতিরিক্ত পণ্য ধরা না পড়লে তা কি শুল্ক ছাড়াই বাজারে চলে যেত?
এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় আড়াই কোটি টাকার শাড়ি ও থ্রিপিসের একটি চালান বন্দরের একাধিক নিরাপত্তা স্তর অতিক্রম করে বাইরে চলে যায়। পরে বিজিবি অভিযান চালিয়ে তা আটক করে। কীভাবে এত বড় একটি চালান নজর এড়িয়ে বেরিয়ে গেল, তার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা এখনো মেলেনি।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য হচ্ছে,২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ৮৯১টি আইজিএমের বিপরীতে কাস্টমস সিস্টেমে কোনো বৈধ বিল অব এন্ট্রির তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ পণ্য প্রবেশের ঘোষণা থাকলেও শুল্ক পরিশোধের কোনো রেকর্ড নেই যা বড় ধরনের অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়।
বেনাপোল কাস্টমস্ সুত্র মতে,চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই বেনাপোল কাস্টমস হাউজে প্রায় ১ হাজার ৮শ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। সূত্র বলছে,এই সময়ে আমদানি কমেনি,বরং উচ্চমূল্যের পণ্যের আমদানি বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে,পণ্যের মূল্য কম দেখানো, মিথ্যা ঘোষণা এবং ঘুষের মাধ্যমে শুল্ক কমিয়ে দেওয়ার কারণেই এই বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ,বন্দর পরিচালক ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু কর্মকর্তাকে একাধিক শেডে দায়িত্ব দিয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন। এর ফলে বন্দরে এক ধরনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা আরও বলেন, বর্তমান পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মিথ্যা ঘোষণা ও ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আমদানির প্রবণতা বেড়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা প্রশ্ন। বন্দরে স্ক্যানার থাকলেও তা সবসময় কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয় না । অনেক ক্ষেত্রে কাগজপত্র মিলিয়ে পণ্য ছাড় দেওয়া হচ্ছে, বাস্তবে পণ্যের প্রকৃতি যাচাই করা হচ্ছে না।
মেসার্স এসটি কর্পোরেশনের স্বত্বাধিকারী ইউনুস আলীসহ একাধিক ব্যবসায়ী বলেন,‘এই অনিয়মের দায় শুধু শেড ইনচার্জদের নয়,বন্দর পরিচালনাকারী শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও নিতে হবে। কারণ তাদের নজরদারি ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা ঘোষণা ও ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য খালাস করছে,যা কোনোভাবেই এককভাবে সম্ভব নয়।’ তারা বলেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বৈধ ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। যারা নিয়ম মেনে উচ্চ শুল্ক দিয়ে পণ্য আমদানি করছেন,তারা প্রতিনিয়ত অসাধু চক্রের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় পড়ছেন। এতে করে সৎ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং বাজারে এক ধরনের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
এ বিষয়ে আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন,‘বেনাপোল স্থলবন্দর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার। এখানে যে কোনো ধরনের অনিয়ম শুধু রাজস্ব খাতেই ক্ষতি করে না, বরং সামগ্রিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমরা বিশ্বাস করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।’
তিনি আরও বলেন,‘বন্দরের কার্যক্রম আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করা, স্ক্যানিং ও মনিটরিং জোরদার করা এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে এ ধরনের সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। আমরা সৎ ব্যবসায়ীরা সবসময় নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে চাই এবং একটি স্বচ্ছ ও সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ প্রত্যাশা করি।’
অভিযোগের বিষয়ে বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক শামীম হোসেন বলেন, ‘মিথ্যা ঘোষণার কিছু পণ্য আটকের ঘটনা আছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে পরবর্তী পরীক্ষায় ঘোষণাকৃত পণ্যই সঠিক পাওয়া গেছে।’ তিনি শেড ইনচার্জদের দায় এড়িয়ে বিষয়টি ব্যবসায়ীদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বদলির বিষয়ে পরিচালক হেঁসে বলেন, আমি তো বদলি হয়ে গেছি । বেশ কয়েক মাস আগে আমার অর্ডার হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমার দায়িত্ব গ্রহণ করার মতো কাউকে না পেলে আমি কিভাবে ডিসচার্জ নেবো।

Read more