বাস্তবে মেধার অপমৃত্যু: প্রাথমিক শিক্ষার কফিনে শেষ পেরেক?

Share

সম্পাদকীয়: একটি স্বাধীন মানচিত্র পাওয়ার পর আমাদের সবথেকে বড় স্বপ্ন ছিল একটি শিক্ষিত ও স্বনির্ভর জাতি। কিন্তু আজ অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলতে হচ্ছে, আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা এক ভয়াবহ ‘আইসিইউ’-তে অবস্থান করছে। যে বুনিয়াদ বা ভিত্তির ওপর একটি জাতির ভবিষ্যৎ দাঁড়িয়ে থাকে, সেই প্রাথমিক শিক্ষাই আজ চরম অনিয়ম আর জবাবদিহিতাহীনতার কবলে।

মাঠপর্যায়ের চিত্রটি কোনো হরর সিনেমার চেয়ে কম নয়। আজ গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো যেন একেকটি অলস সময় কাটানোর কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আমাদের কিছু পর্যবেক্ষণ এবং দাবি নিচে তুলে ধরা হলো:

১. পাসের মহোৎসব বনাম মেধার আকাল: বর্তমানে ৫ম শ্রেণীতে কোনো শিক্ষার্থীকে ফেল করানো হয় না—এটি কি দয়া নাকি প্রতারণা? শিক্ষকরা নিজেদের ব্যর্থতা লুকোতে এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি এড়াতে অযোগ্য শিক্ষার্থীদের জোর করে পাস করিয়ে দিচ্ছেন। ফলে ডায়েরির পাতায় ‘শতভাগ পাস’ লেখা থাকলেও, সেই শিক্ষার্থী নিজের নাম বা ‘Three’ বানানটি পর্যন্ত লিখতে পারে না। আমরা কি শিক্ষিত বেকার বানানোর কারখানা গড়ছি?

২. শিক্ষকদের অপেশাদারিত্ব ও নৈতিক অবক্ষয়: সরকার শিক্ষকদের সম্মানজনক বেতন দিচ্ছেন, কিন্তু বিনিময়ে তারা জাতিকে কী দিচ্ছেন? গ্রামীণ স্কুলগুলোতে নারী শিক্ষকদের একাংশ স্কুলকে যেন ‘অন্তঃপুর’ বানিয়ে ফেলেছেন। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে রোদে বসে উকুন তোলা কিংবা ঘরোয়া গল্পে মগ্ন থাকা—এ যেন এক চিড়িয়াখানা। নিজের সন্তানকে দামী কিন্ডারগার্টেনে পড়িয়ে সরকারি স্কুলের গরিবের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এই অধিকার তাদের কে দিয়েছে?

৩. স্থানীয় রাজনীতির বিষফোঁড়া: শিক্ষকরা যখন নিজ গ্রাম বা এলাকার স্কুলে দশকের পর দশক খুঁটি গেড়ে বসেন, তখন তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তারা কর্মকর্তাদেরও তোয়াক্কা করেন না। শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক আন্তঃজেলা বদলি ছাড়া এই ‘সিন্ডিকেট’ ভাঙা অসম্ভব।

৪. তদারকি কর্মকর্তাদের নির্লিপ্ততা: ডিপিও (DPEO), টিও (TEO) এবং এটিও (ATEO)-দের বিশাল বাহিনী কেন জনগণের টাকায় বেতন পাচ্ছে? তাদের কাজ কি শুধু ফাইল সই করা? তাদের নিয়মিত ঝটিকা পরিদর্শনের অভাবেই আজ স্কুলগুলোর এই দশা। যদি একটি ছাত্র ইংরেজি পড়তে না পারে, তবে তার দায়ে কেন ওই কর্মকর্তাদের কৈফিয়ত দিতে হবে না?

৫. কোচিং বাণিজ্য ও জনজীবন বিপর্যস্ত: সরকারি স্কুলের ব্যর্থতার ওপর দাঁড়িয়ে আজ মোড়ে মোড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো কোচিং আর কিন্ডারগার্টেন গড়ে উঠেছে। এর ফলে শহরগুলোতে কৃত্রিম আবাসন সংকট তৈরি হচ্ছে, বাড়ি ভাড়া দ্বিগুণ বাড়ছে এবং অভিভাবকরা নিঃস্ব হচ্ছেন। এটি কি একটি স্বাধীন দেশের চিত্র হতে পারে?

উপসংহার: আমরা বিলিয়ন ডলারের মেগা প্রজেক্ট চাই না, যদি আমাদের সন্তানরা ন্যূনতম বর্ণজ্ঞানহীন হয়ে বেড়ে ওঠে। মাননীয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে বিনীত অনুরোধ—এই ‘অটোপাস’ আর ‘জবাবদিহিতাহীন’ শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করুন। প্রতিটি পয়সা যা শিক্ষকদের পেছনে খরচ হচ্ছে, তার হিসাব তাদের পাঠদান এবং শিক্ষার্থীর মেধার মাধ্যমে দিতে হবে।

আসুন, অন্ধকারের এই দেয়াল ভেঙে আমরা প্রকৃত ‘সোনার মানুষ’ গড়ার কারখানা গড়ে তুলি।

বিনীত, একজন সংক্ষুব্ধ ও সচেতন নাগরিক।

Read more