গত ২১ নভেম্বর ঢাকার কাছে নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় আঘাত হানে ৫.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প। এতে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়, আহত হন শতাধিক মানুষ। ভূমিকম্পের ফলে অনেক ভবনে ফাটল দেখা দেয়, কিছু ভবনের অংশবিশেষ ভেঙে পড়ে এবং লোকজন আতঙ্কিত হয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। এরপর, চলতি সপ্তাহে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও কয়েকটি মৃদু ভূকম্পন অনুভূত হয়, যা আগের ভূমিকম্পের আফটারশক ছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়া
গত ২৭ নভেম্বর ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের উপকূলে ৬ দশমিক ৬ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্যমতে, ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার গভীরে। ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, এই কম্পন থেকে সুনামি সৃষ্টির কোনো আশঙ্কা ছিল না এবং তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে, নভেম্বর মাসে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসের কারণে ইন্দোনেশিয়ায় এমনিতেই ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, যা উদ্ধার কার্যক্রমকে প্রভাবিত করেছে।
জাপান
গত ২৫ নভেম্বর জাপানের কুমামোটো অঞ্চলে ৫ দশমিক ৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। রিখটার স্কেলে মাঝারি মাত্রার হলেও এর কারণে চারজন আহত হন এবং কিছু ভবন, পানির পাইপ ও রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আফগানিস্তান
নভেম্বরের প্রথম দিকে আফগানিস্তানের বলখ প্রদেশের খুলমে ৬ দশমিক ৩ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এতে অন্তত ২০ জন নিহত ও কয়েকশ আহত হন। এই ভূমিকম্পের প্রভাব আফগানিস্তান, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান এবং চীনের কিছু অংশেও অনুভূত হয়েছিল।
মিয়ানমার
গত ২৩ নভেম্বর মিয়ানমারের উপকূলে ৫ দশমিক ৩ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে, যা থাইল্যান্ডেও অনুভূত হয়। তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
অন্যান্য দুর্যোগ
ভিয়েতনাম: টাইফুনের ধ্বংসলীলা, ৯১ জনের মৃত্যু
ভিয়েতনামে টাইফুন কালমেগি এবং পরবর্তীতে ঝড় কোতোর প্রভাবে ব্যাপক বন্যা ও ভূমিধস দেখা দিয়েছে। এতে অন্তত ৯১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এক সপ্তাহের লাগাতার বর্ষণে দেশটির মধ্যাঞ্চলের প্রায় ৮০০ কিলোমিটার এলাকা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রবল বৃষ্টিতে ডাক লাকের বিপুলসংখ্যক কফি বাগান পানিতে ডুবে গেছে। অঞ্চলটি ভিয়েতনামের প্রধান কফি উৎপাদনকারী এলাকা হওয়ায় অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এবারের বন্যায় দেশটিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৫০ কোটি ডলার। তবে এর বাইরে আরও ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া: বন্যা-ভূমিধসে নিহত ২৪৮
ইন্দোনেশিয়ায় ঘূর্ণিঝড়জনিত প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। এখন পর্যন্ত ২৪৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এখনো শতাধিক মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা (বিএনপিবি) (২৯ নভেম্বর) জানিয়েছে, দুর্যোগকবলিত এলাকার বিভিন্ন স্থানে উদ্ধার অভিযান চলছে। প্রবল বৃষ্টি ও রাস্তা ধসে পড়ায় বহু এলাকায় পৌঁছাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে উদ্ধারকর্মীদের।
থাইল্যান্ড: ৩০০ বছরের সবচেয়ে ভারী বৃষ্টি
থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে, বিশেষ করে হ্যাট ইয়াই শহরে ২৪ ঘণ্টায় ৩০০ বছরের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে ১৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৫ লাখের বেশি মানুষ। বহু কল-কারখানা পানিতে ডুবে গেছে, বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। পর্যটকরা বিভিন্ন হোটেলে আটকা পড়েছেন। এলাকাটিকে দুর্যোগ অঞ্চল ঘোষণা করে জরুরি সাহায্য ঘোষণা করেছে থাই সরকার।
শ্রীলঙ্কা: বন্যা-ভূমিধসে নিহত ১২৩
শ্রীলঙ্কায় বন্যা এবং ভূমিধসে শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় ডিটওয়াহর প্রভাবে মুষলধারে বৃষ্টিপাত এবং বন্যায় শ্রীলঙ্কাজুড়ে এখন পর্যন্ত ১২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও ১৩০ জন নিখোঁজ রয়েছে। সপ্তাহব্যাপী ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে বিভিন্ন স্থানে বাড়ি-ঘর ধ্বংস হয়ে গেছে। এর কারণে অন্তত ৪৩ হাজার মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
মালয়েশিয়া: বন্যায় ঘরছাড়া মানুষ
মালয়েশিয়াতেও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে বন্যা দেখা দিয়েছে। এর জন্য হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বন্যায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কেলান্তান রাজ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির আবহাওয়াবিদরা।
সম্প্রতি নজিরবিহীন খরার কবলে পড়েছে ইরান। বিশেষ করে রাজধানী তেহরানে তীব্র আকার ধারণ করেছে পানির সংকট। এ অবস্থায় শহরটি খালি করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, বৃষ্টি না হলে রাজধানীতে পানির রেশনিং শুরু করতে হতে পারে। তবে রেশনিংয়েও কাজ না হলে তেহরান খালি করার কথা ভাবতে হবে।
ফিলিপাইন: প্রাণঘাতী ঝড়
চলতি মাসের শুরুর দিতে টাইফুন কালমেগির আঘাতে ফিলিপাইনে ২২০ জনের বেশি নিহত হন। এর কয়েকদিন পরেই আঘাত হানে সুপার টাইফুন ফাং-ওং। এর প্রভাবে অন্তত ১০ জন প্রাণ হারান, বাস্তুচ্যুত হন ১৪ লাখের বেশি মানুষ।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এশিয়ার আবহাওয়া ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। তাপমাত্রা বাড়ায় বাতাসে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে স্বাভাবিক মৌসুমি ধারার বাইরে গিয়ে আকস্মিক ভারী বৃষ্টি, বন্যা, ভূমিধস ও ঝড়ের মতো দুর্যোগ বারবার ঘটছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, অতীতের তুলনায় এসব দুর্যোগ এখন বেশি ঘন ঘন, বেশি তীব্র এবং বেশি অপ্রত্যাশিতভাবে ঘটছে। এতে একদিকে যেমন প্রাণহানি বাড়ছে, অন্যদিকে কৃষি, বাসস্থান, অবকাঠামো এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তাই শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষতি কমানো নয়, দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।