ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম সমন্বয়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত তা নিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিস্ফোরক মন্তব্যে’ নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে।
সরকার এবং সরকারি দল বিএনপি চুপ থাকলেও মমতার মন্তব্যের পর সরব জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী দলগুলো।
গত বছরের ডিসেম্বরে রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে প্রকাশ্য দিবালোকে নিখুঁত নিশানায় মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয় ওসমান হাদিকে। চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের পর গড়িয়েছে পাঁচ মাসের বেশি সময়।
হাদি হত্যাকাণ্ডে বিদেশি শক্তিও জড়িত থাকার গুঞ্জন-অভিযোগের মধ্যে মমতার বিস্ফোরক মন্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সাধারণ মানুষের চায়ের আড্ডা—সবখানেই এখন একটাই প্রশ্ন: হাদি হত্যার আসল মাস্টারমাইন্ড কে? কারা নেপথ্যে থেকে এ হত্যার ছক কষেছিল?
কী বলেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?
মঙ্গলবার (২ জুন ২০২৬) কলকাতার ধর্মতলায় এক প্রতিবাদী অবস্থান কর্মসূচিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বাংলাদেশ থেকে আসা এক দুর্ধর্ষ খুনি মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের পর রাজ্য পুলিশের এসটিএফ তাকে গ্রেফতার করে। এরপরই ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাকে ফোন করে ‘দেশের স্বার্থে’ বিষয়টি গোপন রাখতে বলেছিলেন।
মমতা বলেন, কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়েছিল? আজকের সরকার পরিবর্তন হলেও আমি সবটাই জানি।
তিনি আরও বলেন, সেই নামটা বলতে চাইছি না।
বললে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে যাবে। আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি, তাই দেশের স্বার্থে ওই নাম আমি বলব না।
মমতার এই বক্তব্য মুহূর্তেই বাংলাদেশে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে পরিণত হয়।
মমতার মন্তব্য নিয়ে নিরব সরকার
মমতার মন্তব্যের পর বিএনপি সরকার দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে প্রাধান্য দিয়ে কূটনৈতিক ভাষায় কথা বলছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এ প্রসঙ্গে বলেন, আকাশপাতাল বলে তো লাভ নেই। আরেকটা দেশে নির্বাচন হয়েছে, সে দেশে একজন পরাজিত নেতা একটা কথা বলেছেন— দ্যাট ইজ নট আওয়ার ম্যাটার টু ডিসকাস।
তিনি আরও বলেন, হাদি হত্যার আসামি যারা ভারতে গ্রেফতার আছে, তাদের দ্রুত ফিরিয়ে এনে বিচারের আওতায় আনা হবে। ভারত সরকার যদি এখন বাংলাদেশকে হাদি হত্যার ব্যাপারে কিছু বলে, অবশ্যই আমরা দেখব। এটি নিয়ে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত সিরিয়াসলি কাজ করছে।
সরব জামায়াত-এনসিপিসহ বিভিন্ন দল
মমতার মন্তব্যে হাদি হত্যা ও এর বিচার নিয়ে সরব হয়ে উঠেছেন জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, তার কথা থেকে বোঝা যায়, ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভারত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। আধিপত্যবাদী চিন্তা থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত যে খেলা খেলে, এটি তারই প্রমাণ। সরকারের উচিত ভারত সরকারের কাছে এর ব্যাখ্যা চাওয়া।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন প্রশ্ন তোলেন, সীমান্তে এত কড়াকড়ি থাকা সত্ত্বেও খুনিরা কীভাবে এত সহজে ভারতে আশ্রয় পেল? তিনি মনে করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য এই রহস্যের জট খুলতে সহায়তা করবে, বাংলাদেশ সরকারের এখনই দিল্লির কাছে জবাব চাওয়া উচিত।
মাঠে নামছে ইনকিলাব মঞ্চ
হাদি হত্যার মূল পরিকল্পনাকারীদের নাম প্রকাশ এবং খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে ফের রাজপথে নেমেছে ইনকিলাব মঞ্চ।
মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবেরের নেতৃত্বে দেশব্যাপী মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চের নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীরা অপরাধ সম্পন্ন করার পর ভারতে পালিয়ে যায়। ভারত সরকার তাদের সহজে আমাদের হাতে তুলে দেবে না। সরকারকে অনতিবিলম্বে বিদ্যমান বন্দিবিনিময় চুক্তি অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে।
এদিকে মামলাটির বর্তমান তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ভারপ্রাপ্ত প্রধান ডিআইজি আলি আকবর খান জানান, মামলাটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তদন্তে ইতিমধ্যে ২১৮ কোটি টাকার একটি স্বাক্ষরিত চেকের হদিস মিলেছে, যা এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে বিশাল অর্থায়নের দিকে সরাসরি ইঙ্গিত করে।
জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পিস্তলটি সীমান্ত পেরিয়ে আসার পর পাঁচবার হাতবদল হয়। চট্টগ্রামের অস্ত্র বিক্রেতা মাজেদুল এবং সাভারের হেলালকে রিমান্ডে নিয়ে জানা যায়, অস্ত্রটি ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। সেখান থেকে এটি মূল শুটার ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ফয়সাল করিম মাসুদের হাতে পৌঁছায়। এই মিশন সফল করতেই সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফয়সালকে কারাগার থেকে বের করা হয়েছিল।
সিআইডি জানায়, এ মামলায় এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ১১ জন ও ভারতে ৩ জন গ্রেফতার হয়েছে। দেশের ১১ জনের মধ্যে ৯ জনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, যেখানে আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের পিএস বিপ্লব এবং আদাবর থানা ছাত্রলীগের সেক্রেটারি রুবেলের নাম উঠে এসেছে।
আলি আকবর খান বলেন, দরকার হলে আমরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও জিজ্ঞাসাবাদ করব। তবে তার আগে আইনি জটিলতাগুলো দূর করতে হবে। ভারতে গ্রেফতার ফয়সাল ও আলমগীরকে ফিরিয়ে আনতে আমরা ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স’-এর আওতায় চিঠি দিয়েছি।
তদন্তের এই দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে ২ জুন রাতে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব (চুক্তিভিত্তিক) ও হাদির বড় ভাই শরীফ ওমর বিন হাদি ফেসবুকে দুটি বিস্ফোরক পোস্ট দেন।
তিনি অভিযোগ করেন, শহীদ ওসমান হাদির খুনের সঙ্গে ইন্টেরিম (অন্তর্বর্তী) সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা এবং বিএনপি সরকারের কয়েকজন এমপি-মন্ত্রী সরাসরি জড়িত।
অপর এক পোস্টে তিনি বলেন, হাদি হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরিতে আমিরে জামায়াতের একজন ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) জড়িত। হাদিকে ঢাকা-৮ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যাপক প্রেসার দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র ফারুক হাসান পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন ওমর হাদির দিকেই। তিনি দাবি করেন, হাদির মৃত্যুর পর সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছেন তার বড় ভাই। যিনি দ্রুততম সময়ে লন্ডনে এই লোভনীয় নিয়োগ পেয়েছেন। ফারুক হাসান প্রশ্ন তোলেন, যদি অন্তর্বর্তী সরকারই জড়িত থাকে, তবে তিনি কেন সেই সরকারের অধীনে চাকরি নিলেন?