ছয় জেলায় বজ্রপাতে ১২ জনের মৃত্যু

Share

দেশের ছয় জেলায় বজ্রপাতে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার দুপুর থেকে বিকালের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে।

মৃতদের মধ্যে রয়েছেন- সুনামগঞ্জের তিন উপজেলায় পাঁচজন, রংপুরের মিঠাপুকুরে দুজন, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে একজন, কিশোরগরঞ্জের করিমগঞ্জে একজন, নেত্রকোনায় একজন, ময়মনসিংহের গৌরীপুরে একজন ও গফরগাঁওয়ে একজন।

শনিবার দুপুরে পৃথক পৃথক বজ্রপাতে তারা মারা যান। এ সময় আহত হয়েছেন আরও অনেকে। তাদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, ধর্মপাশা, দিরাই ও জামালগঞ্জ উপজেলায় বজ্রপাতে এক শিক্ষার্থীসহ পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন- ধর্মপাশার হবিবুর রহমান (২২) ও রহমত উল্লাহ (১৩), তাহিরপুরের আবুল কালাম ওরফে কালা মিয়া (২৮), দিরাইয়ের লিটন মিয়া (৩৮) ও জামালগঞ্জের নূর জামাল (২২)।

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ( মিডিয়া) সুজন সরকার জেলায় বজ্রপাতে পাঁচজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জানা গেছে, ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নের বড়ইহাটি গ্রামের হবিবুর রহমান শনিবার সকালে তার চাচার সঙ্গে টগার হাওড়সংলগ্ন চকিয়াচাপুর গ্রামে বোরো ধান কাটতে যান। সেখানে দুপুরের দিকে হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড় শুরু হলে বজ্রপাতে হবিবুর রহমানসহ কয়েকজন আহত হন।

পরে গুরুতর আহতাবস্থায় হবিবুরকে নিয়ে ধর্মপাশা সদর হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হলে পথেই তার মত্যু হয়। আহতরা স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়েছেন।

হবিবুর রহমানের বাড়ি ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নের বড়ইহাটি গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের ফজলুর রহমানের ছেলে এবং বাদশাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

অপরদিকে দুপুর ১টার দিকে একই উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের সরস্বতীপুর ইসলামপুর গ্রামে আকস্মিক বজ্রপাতে জয়নাল হক (৩৫), তার ছেলে রহমত উল্লাহ (১৩) এবং একই গ্রামের শিখা মনি (২৫) গুরুতর আহত হন। পরে তাদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে রহমত উল্লাহকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন এবং জয়নাল ও শিখা মনিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়।

স্থানীয় ইউপি সদস্য রহিস মিয়া ঘটনার সত্যতা যুগান্তরকে নিশ্চিত করেছেন।

এছাড়া জেলার তাহিরপুরে বজ্রপাতে একজনের মৃত্যু ও আরেকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। মৃতের নাম আবুল কালাম ওরফে কালা মিয়া (২৮)।

জানা গেছে, দুপুর ১২টার দিকে তাহিরপুর উপজেলার জামলাবাজ গ্রামে আকস্মিক ব্রজ্রপাতে কালা মিয়ার মৃত্যু হয়েছে। তিনি সদর ইউনিয়নের গাজীপুর গ্রামের আবু বকরের ছেলে। দুই সন্তানের বাবা কালা মিয়া একটি হাঁসের খামারে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। একই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের জামলাবাজ গ্রামের নুর মোহাম্মদ (২৪)। তিনি জামলাবাজ গ্রামের আব্দুল আওয়ালের ছেলে। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেটে পাঠানো হয়েছে।

জামলাবাজ গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বৃষ্টিহীন আকস্মিক বজ্রপাতে এ ঘটনা ঘটে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নওশাদ আহমেদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে দিরাই উপজেলায় বজ্রপাতে লিটন মিয়া (৩৮) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি উপজেলার পেরুয়া আশনাবাজ গ্রামের চান্দু মিয়ার ছেলে।

দুপুর ১টায় কালিয়াগোটার (আতরার) হাওড়ের একটি বিলের পাশে ধান কাটার সময় আকস্মিক বজ্রপাতে তিনি গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. প্রশান্ত দাস তালুকদার লিটন মিয়ার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে, জামালগঞ্জের পাকনার হাওড়ে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে আরও একজন কৃষকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তার নাম নূর জামাল (২২)। তিনি উপজেলার চানপুর গ্রামের আমীর আলীর ছেলে। এ সময় তোফাজ্জল হোসেন (২৩) নামে একজন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

রংপুর : জেলার মিঠাপুকুরে বিলে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে দুই জেলের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ১০ জন। দুপুরে এ ঘটনায় মৃতরা হলেন- উপজেলার বড় হযরতপুর ইউনিয়নের ছোট হযরতপুর মাঝিপাড়া গ্রামের অলিন রায়ের ছেলে মিলন রায় (৩০) ও রামেশ্বরপাড়া গ্রামের আনছের আলীর ছেলে আবু তালেব (৫৫)।

মিঠাপুকুর থানার ওসি নুরুজ্জামান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

তারা অন্য জেলেদের সঙ্গে সকালে পাশের ছোট শালমারা বিলে মাছ ধরতে যান। দুপুরে হঠাৎ ওই এলাকায় পরপর কয়েকটি বজ্রপাত হয়। এতে ১০ জন আহত হন। তাদের মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে মিলন ও আবু তালেব মারা যান।

আহতদের মধ্যে গোল্ডেন মিয়া, তার স্ত্রী লিমা বেগম, মর্জিনা বেগম, জগদীশ রায়, সুবল, নিখিল, শামছুলসহ ১০ জনকে মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে গোল্ডেন ও লিমা বেগম বিলের ধারে মাছ ধরা দেখছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শী উজ্জল মিয়া ও রাজু আহম্মেদ বলেন, আমরা বিলের ধারে মাছ ধরা দেখছিলাম। আকাশ ভালোই ছিল। হঠাৎ প্রচণ্ড বাতাস ও বজ্রপাত শুরু হয়। সেখানেই দুজন মারা যান।আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

হবিগঞ্জ : জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার বিবিয়ানা নদীর তীরে মমিনা হাওড়ে মাছ ধরতে গিয়ে দুপুরে বজ্রপাতের কবলে পড়ে সুনাম উদ্দিন (৩৫) নামের এক ব্যক্তির ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়েছে। তিনি রামপুর গ্রামের সুন্দর আলী পীরের ছেলে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলার পূর্ব বড় ভাকৈর ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের সুন্দর আলী পীর সাহেবের ছেলে সুনাম উদ্দিন মমিনা হাওরে মাছ ধরতে যায়। বেলা দেড় টার দিকে বৃষ্টির সময় হঠাৎ বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।

খবর পেয়ে নবীগঞ্জ থানার পুলিশ ঘটনাস্থল গিয়ে মৃতদেহ উদ্ধার করে। থানার ওসি মোনায়েম মিয়া ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

কিশোরগঞ্জ : জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার বড় হাওড়ে বোরো ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে হলুদ মিয়া নামে এক কৃষক নিহত হয়েছেন। দুপুর ২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

হলুদ মিয়া (৩৭) উপজেলার ৯নং জয়কা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের উত্তর কলাবাগ গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ওই গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে।

জানা গেছে, দুপুরে বড় হাওড়ে ধান কাটার সময় হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টির সময় বজ্রপাতের কবলে পড়ে গুরুতর আহত হন হলুদ মিয়া। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয় তার।

করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. এমরানুল কবির ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

ময়মনসিংহ : গৌরীপুর উপজেলার বায়ড়াউড়া ভালকিবিলে ধান কাটতে গিয়ে রহমত আলী উজ্জ্বল (৪০) নামে এক কৃষক বজ্রপাতে মারা গেছেন। তিনি কোনাপাড়া গ্রামের অলি উল্লাহর ছেলে।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, উজ্জল দুপুরে ধান কাটতে গেলে বজ্রপাতে গুরুতর আহত হন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ফেরদৌস আল মামুন তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ডাক্তার জানান, হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই তিনি মারা গেছেন।

এছাড়া গফরগাঁও উপজেলার উস্তি ইউনিয়নে বজ্রপাতে মমতাজ আলী (৭০) নামে এক কৃষক মারা গেছেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, মাঠে কাজ করছিলেন মমতাজ। বিকালে বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।

নেত্রকোনা : জেলার আটপাড়ায় হাওড়ে গরুর জন্য ঘাস কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে আলতু মিয়া (৬৫) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে।

দুপুরে উপজেলার সুখারী ইউনিয়নের হাতিয়া গ্রামের সামনের মেষির হাওড়ে এ ঘটনা ঘটে। আলতু মিয়া একই গ্রামের মৃত লাল মিয়ার ছেলে।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গ্রামের সামনের মেষি হাওড়ে গরুর জন্য ঘাস কাটতে যান আলতু মিয়া। কিছুক্ষণ পর আকাশ অন্ধকার করে বৃষ্টিসহ বজ্রপাতের সৃষ্টি হয়। পরে স্থানীয়রা হাওড়ে গিয়ে আলতু মিয়ার নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে বাড়িতে নিয়ে আসেন।

আটপাড়া থানার ওসি জুবায়দুল আলম জানান, ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে, মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে।

আটপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহানুর রহমান জানান, বজ্রপাতে নিহত পরিবারের সঙ্গে উপজেলা প্রসাশন থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে, তাদের প্রসাশনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা করা হবে।

Read more