ফরিদপুর প্রতিনিধি: হলফনামার মৌলিক পরিবর্তন ও আয়কর রিটার্নের কপি পরির্তনের সুযোগ দিয়ে বিএনপির প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ করে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ফরিদপুর জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর-১ আসনের প্রার্থীর বিশেষ এই সুবিধা দেওয়া নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
গত রবিবার মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই চলাকালে হলফনামায় মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার তথ্য উপস্থাপন না করা, অসম্পূর্ণ, ভুল এবং মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পান রিটার্নিং কর্মকর্তা। তবে, অভিযোগ সত্ত্বেও যাচাই-বাছাইয়ে বিএনপি প্রার্থী খন্দকার নাসিরুল ইসলামের মনোনয়নপত্র বাতিল না করে হলফনামা সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়। এই সুযোগ করে দেওয়ার পেছনে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে তিনি সুবিধাভোগী অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজেকে বৈষম্যের শিকার দাবি করেন। এমন প্রেক্ষাপটে বিতর্কিত হলফনামা ও আয়কর রিটার্ন থাকা সত্ত্বেও একটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত তার নিরপেক্ষতা ও পেশাগত দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
নির্বাচন কমিশনের জারি করা পরিপত্র-৭ অনুযায়ী, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ১২(৩খ) অনুসারে প্রত্যেক প্রার্থীকে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে সত্য ও স্বয়ংসম্পূর্ণ তথ্য সংবলিত হলফনামা এবং সর্বশেষ আয়কর রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, হলফনামায় অসত্য তথ্য প্রদান, তথ্য গোপন বা প্রমাণপত্র দাখিলে ব্যর্থ হলে মনোনয়নপত্র বাতিলযোগ্য।
অভিযোগ রয়েছে, ফরিদপুর-১ আসনের ওই বিএনপি প্রার্থী মনোনয়ন দাখিলের পর তার হলফনামা ও আয়কর রিটার্নে সম্পদ, আয় ও দায় সংক্রান্ত একাধিক তথ্য পরিবর্তন করেন। বিশেষ করে আয়কর রিটার্নে প্রদর্শিত বার্ষিক আয় ও সম্পদের পরিমাণ পূর্বে দাখিলকৃত নথির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। যদিও পরবর্তীতে সম্পূরক এফিডেভিটের মাধ্যমে এসব পরিবর্তন আনা হয়।
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সম্পূরক এফিডেভিট গ্রহণযোগ্য হলেও ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন বা ভুল তথ্য প্রদান প্রমাণিত হলে মনোনয়ন গ্রহণযোগ্য হবে না। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে—উল্লেখিত পরিবর্তনগুলো কি সাধারণ সংশোধন, নাকি মৌলিক তথ্য পরিবর্তনের শামিল?
স্থানীয় একাধিক প্রার্থী ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, হলফনামার তথ্য বাছাইয়ের সময় প্রয়োজনীয় যাচাই যথাযথভাবে হয়নি। পরিপত্র অনুযায়ী মনোনয়নপত্র বাছাইকালে ব্যাংক কর্মকর্তা, আয়কর বিভাগের প্রতিনিধি এবং থানার কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ঋণ, আয়কর ও ফৌজদারি মামলার তথ্য যাচাই করার কথা থাকলেও বাস্তবে সে প্রক্রিয়া কতটা কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘প্রার্থী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করেছেন এবং বিধি অনুযায়ী মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।’ তবে হলফনামা ও আয়কর রিটার্নে পরিবর্তনের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, হলফনামা নির্বাচনী স্বচ্ছতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সেখানে মৌলিক তথ্য পরিবর্তনের অভিযোগ থাকলেও যদি মনোনয়ন বহাল থাকে, তবে তা ভবিষ্যতে নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারে।
বিষয়টি নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।