পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে নতুন করে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের সাতটি ‘ফাস্ট বোট’ বা দ্রুতগামী স্পিডবোট ধ্বংস করেছে। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ তেল বন্দরে ইরানি হামলার পর সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে।
সোমবার (৫ মে) হরমুজ প্রণালীতে আটকা পড়া জাহাজগুলোকে উদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ চলাকালীন এসব ঘটনা ঘটে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের জেরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে আছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ইরানের সাতটি ছোট নৌকা বা যেগুলোকে তারা ফাস্ট বোট বলে, সেগুলো ভূপাতিত করেছি। তাদের এখন এটুকুই অবশিষ্ট আছে।’ মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হেলিকপ্টার ব্যবহার করে ওই বোটগুলোতে হামলা চালানো হয়েছে।
তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ট্রাম্পের এই দাবি অস্বীকার করেছে। তাসনিম নিউজ এজেন্সি এক সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, মার্কিন হামলায় কোনো স্পিডবোট নয়, বরং দুটি ছোট পণ্যবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এতে পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। ইরান আরও দাবি করেছে, তারা একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে সতর্কতামূলক গুলি ছুড়েছে, যদিও ওয়াশিংটন এই দাবি নাকচ করে দিয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের ফুজাইরাহ তেল বন্দরে ইরানি হামলার পর বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। আমিরাতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১২টি ব্যালিস্টিক মিসাইল, তিনটি ক্রুজ মিসাইল এবং চারটি ড্রোন প্রতিহত করার দাবি করেছে। এই হামলায় তিনজন আহত হয়েছেন। এছাড়া আদনক-এর একটি ট্যাংকার এবং দক্ষিণ কোরিয়ার একটি জাহাজেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
এই হামলার খবরের পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম ৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রতি ব্যারেল ১১৫ ডলার ছাড়িয়েছে।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিপিং কোম্পানি ‘ম্যাস্ক’ নিশ্চিত করেছে যে, মার্কিন সামরিক সুরক্ষায় তাদের একটি জাহাজ অ্যালায়েন্স ফেয়ারফ্যাক্স সফলভাবে হরমুজ প্রণালী পার হতে পেরেছে। ফেব্রুয়ারি থেকে জাহাজটি সেখানে আটকা পড়েছিল। ট্রাম্পের ঘোষিত প্রজেক্ট ফ্রিডম-এর আওতায় এই উদ্ধার অভিযান চালানো হয়। প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের আটকা পড়া জাহাজ উদ্ধারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২ হাজার জাহাজে ২০ হাজার নাবিক সেখানে আটকা পড়ে আছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেছেন, প্রজেক্ট ফ্রিডম আসলে একটি মৃত প্রকল্প। এই রাজনৈতিক সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই।
অন্যদিকে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। ওমান জানিয়েছে, তাদের উপকূলীয় এলাকায় একটি আবাসিক ভবনে হামলায় দুইজন আহত হয়েছেন। কাতার এই হামলার নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর ইরান এই পথটি বন্ধ করে দেয়। এপ্রিলের শুরুতে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি হলেও এখন পর্যন্ত সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য পথটি উন্মুক্ত হয়নি।
সূত্র: বিবিসি