ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রভাবে তীব্র সংকটের মুখে পড়েছে মার্কিন বিমান সংস্থা স্পিরিট এয়ারলাইনস। জেট ফুয়েলের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি ব্যয় মেটাতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি সরকারের প্রস্তাবিত বেইলআউট পরিকল্পনায় ঋণদাতাদের সমর্থন পেতেও ব্যর্থ হয়েছে তারা। সব মিলিয়ে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে এয়ারলাইনসটি।
শনিবার (২ মে) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন বার্তাসংস্থা এপি।
স্পিরিট এয়ারলাইনসের বন্ধ হয়ে যাওয়ার এই ঘটনাকে ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম বড় শিল্প বিপর্যয় বলে বর্ণনা করেছে বার্তাসংস্থাটি। এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধিতে টিকে থাকার সক্ষমতা হারিয়েছে কোম্পানিটি; চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ১৭ হাজার কর্মী।
কোম্পানিটিকে বাঁচানোর জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৫০ কোটি ডলারের একটি সরকারি বেলআউট প্রস্তাব করেছিলেন। তবে, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা এবং কংগ্রেসের অনেক রিপাবলিকান সদস্যের বিরোধিতার কারণে সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হয় এই পরিকল্পনা। দুই বছরের কম সময়ের মধ্যে এটি ছিল স্পিরিট এয়ারলাইনসের দ্বিতীয়বারের মতো দেউলিয়া হওয়ার ঘটনা।
স্পিরিট এয়ারলাইনস যুক্তরাষ্ট্রের মোট ফ্লাইটের ৫ শতাংশ পরিচালনা করতো। অন্য এয়ারলাইনসগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যাত্রীদের জন্য ভাড়া কম রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল সংস্থাটি।
প্রসঙ্গত, ইরানের পরমাণু প্রকল্প এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ দিন ধরে সংলাপ চলে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে। ২৭ ফেব্রুয়ারি কোনো প্রকার সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয় সেই সংলাপ।
পরের দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই সময়ে ইরানে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ শুরু করে ইসরায়েলও।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এ যৌথ হামলার প্রথম ধাক্কাতেই প্রাণ হারান ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লাগাতার হামলায় প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি, সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপৌরসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে হারায় ইরান। ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ ও ধ্বংস হয় দেশটির বিভিন্ন সামরিক-বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। সেইসঙ্গে প্রাণ হারায় ইরানের ২ হাজারের বেশি মানুষ।
যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে শক্ত জবাব দেয় ইরানও। যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের ৬ দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্তর আরব আমিরাত, ওমানে অবস্থিত মার্কিন সেনাঘাঁটি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে দফায় দফায় ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় দেশটি। ইরানের লাগাতার হামলার মুখে করুণভাবে ভেঙে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও। এ অবস্থায় আবার ইরানের পক্ষে যোগ দেয় লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতি বাহিনী; যা ইরানের শক্তি অনেকটাই বাড়িয়ে দেয় যুদ্ধে।
এছাড়া, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ইরানের হামলায় ভয়ংকর বিপদের মুখে পড়ে যায় ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্ররা। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ধস নামে মার্কিন তেল বাণিজ্যেও।
এ অবস্থায় ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানোর জন্য শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের দ্বারস্ত হয় যুক্তরাষ্ট্র। টানা ৩৮ দিন হামলা-পাল্টা হামলার পর গত ৭ এপ্রিল ১৫ দিনের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় দুইপক্ষ। গত ২৩ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত কোনও পক্ষই অন্য পক্ষের ওপর হামলা চালায়নি। তবে, কোনও ধরনের সমঝোতায়ও পৌঁছাতে পারেনি তারা।
ফলে, একে অপরকে চাপে রাখতে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ জারি করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এতে গুরুত্বপূর্ণ এ বাণিজ্যপথে জাহাজ চলাচল সম্ভব না হওয়ায় অস্থির হয়ে উঠেছে তেলের আন্তর্জাতিক বাজার, যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও; ব্যারেল প্রতি প্রায় ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে অপরিশোধিত তেলের দাম। সেইসঙ্গে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে জেট ফুয়েলের দামও। পাশাপাশি বেড়ে যাচ্ছে অন্যান্য জ্বালানির দামও।