তৃণমূলে শক্তি দেখানোর বড় প্রস্তুতি জামায়াতের

Share

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত না হলেও এ নিয়ে বসে নেই রাজনৈতিক দলগুলো। জয় পেতে সব দলই নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই নির্বাচন ঘিরে প্রার্থী বাছাইসহ নানামুখী কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে সংসদে প্রথমবারের মতো বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের বিস্তর প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি।

জানা গেছে, দীর্ঘ সময় পর সংসদ নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিজয় লাভের পর এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোযোগ দলটির। একই সঙ্গে ত্রয়োদশ সংসদের চলমান অধিবেশনের দিকেও নজর রাখছেন জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা। আগামী শনিবার ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেখানে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতিসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। জামায়াতের লক্ষ্য রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে জয়ী হওয়া। এবার শুধু অংশগ্রহণ নয়, বরং বড় ব্যবধানে জয়ের লক্ষ্য নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করছে তারা। সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের জোর প্রস্তুতি দেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, মাঠ দখলের এই প্রস্তুতি ভোটের বাক্সে কতটা প্রতিফলন ঘটাতে পারে।

একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের লক্ষ্যে চূড়ান্ত পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় স্থানীয়ভাবে (সিটি করপোরেশন ছাড়া) প্রায় ৫০ ভাগ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পরিস্থিতি বুঝে অন্যান্য প্রার্থীর নামও ঘোষণা করা হবে। যদিও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই বিভিন্ন সিটিতে সম্ভাব্য কাউন্সিলররা নিজেদের প্রচার শুরু করেন। এবার সংসদ নির্বাচনের পর উপজেলা ও পৌরসভা এমনকি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রচার শুরু করেছেন। তবে সংসদ নির্বাচনের পর একদিকে নেতাকর্মীদের মাঝে চাঙ্গাভাব দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে প্রত্যাশিত বিজয় না আসায় এ নিয়ে পর্যালোচনাও হচ্ছে বলে জানা গেছে। তা ছাড়া নির্বাচন কমিশন (ইসি) এখনো স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে একটু ধীরগতিতে এগোচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিসহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে তাড়াহুড়ো করতে চায় না ইসি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য গত ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বশীল নেতাদের কাছে প্রস্তাবনা চেয়েছিল জামায়াত। এরপর প্রত্যেক সিটি করপোরেশন থেকে সম্ভাব্য তিনজনের একটি প্যানেল করে কেন্দ্রীয় অফিসে পাঠানো হয়। এখন কেন্দ্রীয় নেতারা পর্যালোচনা করে প্রার্থী চূড়ান্ত করবেন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয় সরকার-সংক্রান্ত আইনগুলো সংশোধন করেছে অধ্যাদেশের মাধ্যমে। পরিবর্তন করা হয়েছে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশও। এসব অধ্যাদেশ নতুন সংসদে অনুমোদন পেলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আবারও নির্দলীয় পদ্ধতিতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইসি স্থানীয় সরকার ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে। তবে এ-সংক্রান্ত আইনগত বিধিবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে দ্রুতই তপশিল ঘোষণার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এরই মধ্যে আগামী ৯ এপ্রিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বগুড়া-৬ নির্বাচনী এলাকার শূন্য আসনের নির্বাচন এবং শেরপুর-৩ নির্বাচনী এলাকার নির্বাচন হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, জামায়াতে ইসলামী স্থানীয় নির্বাচনে চূড়ান্ত প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা নিয়ে এগোবে—এটা স্বাভাবিক। কারণ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দলটি তাদের অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে ৭৭টি আসনে জয় পেয়েছে। এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও জামায়াত তাদের অস্তিত্বের জানান দিতে চাইবে। কারণ স্থানীয় সরকার নির্বাচন তথা তৃণমূলের এই লড়াইয়ে তারা সফল হলে জাতীয় রাজনীতিতে দরকষাকষির ক্ষমতা আরও অনেক বেড়ে যাবে।

জানা গেছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে, এমনটি মাথায় রেখেই প্রস্তুতি শুরু করেছে জামায়াতে ইসলামী। ঢাকার দুই সিটির আওতাধীন ১৫টি আসনের ৭টিতে জয়ী হয়েছে দলটি। তবে সম্প্রতি প্রায় সব সিটি করপোরেশনে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার, যাদের সবাই বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা। ফলে নির্বাচন না করে প্রশাসক নিয়োগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো। অবিলম্বে তারা প্রশাসক নিয়োগ বাতিল ও নির্বাচন চান।

তৃণমূল থেকে প্রার্থী বাছাই শুরু: জামায়াতে ইসলামী এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে কোনো তাড়াহুড়া করছে না। প্রতিটি উপজেলা, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে যোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থী খুঁজে বের করতে কমিটি গঠন করা হয়েছে। দলের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, সুষ্ঠু ভোট হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় চমক দেখাবে তাদের দল। দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের দায়িত্বশীল নেতাদের মাঝে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়র, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ প্রায় শেষ। এরই মধ্যে বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নামের তালিকা কেন্দ্রে জমা হয়েছে। তা ছাড়া স্থানীয়ভাবে জেলা, উপজেলা এবং পৌরসভা পর্যায়ে প্রায় ৫০ শতাংশ প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত হয়েছে। চলতি এপ্রিলের মধ্যেই অন্যান্য উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই চূড়ান্ত হবে বলে জানা গেছে। তৃণমূলের প্রস্তাবনা পর্যালোচনা হবে জামায়াতের নীতিনির্ধারণী ফোরাম কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে। তারপর সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম চূড়ান্ত ও ঘোষণা করা হবে।

মূলত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর সাংগঠনিক কার্যক্রম বিস্তৃত পরিসরে জোরদার করেছে দীর্ঘদিন কোণঠাসা থাকা জামায়াতে ইসলামী। কেন্দ্র থেকে শুরু করে মহানগর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তারা নিয়মিত কর্মী সম্মেলন ও সুধী সমাবেশ করে। তৃণমূলের কর্মীরা মনে করছেন, ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে তারা যে প্রতিকূলতা পার করেছেন, তার জবাব এবার ব্যালটের মাধ্যমে দিতে চান। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটবদ্ধ হয়ে না কি এককভাবে লড়বে জামায়াত—তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি। তবে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে দেওয়া নির্দেশনায় স্পষ্ট যে, আপাতত কারও ওপর নির্ভর না করে প্রত্যেক এলাকায় নিজস্ব শক্তিশালী অবস্থান তৈরির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি বুঝে নির্দিষ্ট কিছু স্থানে কৌশলগত সমঝোতা হলেও বেশিরভাগ জায়গায় একক প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি রাখছে।

স্থানীয় নির্বাচনও কি জোটবদ্ধ হবে: জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতোই স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ১১ দলীয় ঐক্যের ব্যানারে সমঝোতার ভিত্তিতে প্রার্থী থাকবে কি না সে সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। বরং এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার আলোচনা আছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনে আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এমন অবস্থার মধ্যেই ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনসহ দেশের পাঁচটি সিটি করপোরেশনের আসন্ন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বাকি সাত সিটি করপোরেশনেও শিগগির প্রার্থী ঘোষণা করবে দলটি। এ ছাড়া উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনের জন্য এপ্রিলের মধ্যে প্রার্থী ঘোষণার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন দলটির নেতারা।

জামায়াতের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানান, রাজধানীর দুই সিটিতেই মেয়র পদে দল সমর্থিত প্রার্থী থাকবে। ঢাকা উত্তরে জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন মহানগর উত্তরের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। তিনি এবার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৬ আসনে মাত্র ৯ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। তাকে সংসদীয় রাজনীতিতেই রাখা হবে। তাই জামায়াতকে উত্তরে নতুন একজন মেয়র প্রার্থী খুঁজতে হবে। এ ছাড়াও ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের এমপি প্রার্থী মো. এনায়েত উল্লাহ আলোচনায় আছেন। পুরান ঢাকার এই নেতা ঢাকা-৭ আসনে বিএনপি প্রার্থীর ১ লাখ ৪ হাজার ৬৬৬ ভোটের বিপরীতে ৯৮ হাজার ৪৮৩ ভোট পেয়েছেন।

জামায়াতের নেতারা জানান, ঢাকায় মেয়র পদে জোট শরিকদের ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। কাউন্সিলর পদে সমঝোতা হতে পারে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে চমক দেখাতে চায় জামায়াত। দলটির উচ্চপর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, সংসদ নির্বাচন ছিল অস্তিত্বের জানান দেওয়া, আর স্থানীয় নির্বাচন হবে শক্তি প্রদর্শনের। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াত সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে। জয়ের লক্ষ্যে শুধু ‘ত্যাগী’ নয়, বরং এলাকায় যার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতা বেশি, তাকেই মনোনয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। নির্বাচনী এলাকার মানুষের সেবায় নিয়োজিত থেকে ক্লিন ইমেজের সামাজিক কর্মী হিসেবে প্রার্থীদের তুলে ধরা হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং সাবেক সংসদ সদস্য ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ কালবেলাকে বলেন, ‘এখন তো ত্রয়োদশ সংসদের অধিবেশন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের সামনে হাজির। তাছাড়া নতুন সরকার দ্রুত সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আয়োজনের কথা বলছে; কিন্তু দৃশ্যমান কিছু তো দেখা যাচ্ছে না। তার আগেই দেশের প্রায় সব সিটি করপোরেশনে এবং জেলা পরিষদে বিএনপির দলীয় লোকদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটি খুবই দুঃখজনক।’

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইসহ বিভিন্ন জামায়াতের প্রস্তুতি বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছি। পরিস্থিতি বুঝে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

এ প্রসঙ্গে দলটির কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের প্রার্থী কেন্দ্র থেকে ঘোষণা দেওয়া হবে। এরই মধ্যে প্রায় সব সিটি করপোরেশন থেকে তিনজন করে প্রার্থীর নামের তালিকা আমরা হাতে পেয়েছি। পাশাপাশি উপজেলা, পৌরসভা এবং অন্যান্য পর্যায়ে প্রার্থী ঠিক করতে একইভাবে নির্দেশনা দিয়েছি। এরই মধ্যে স্থানীয়ভাবে সবমিলিয়ে প্রায় ৫০ ভাগ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বশীলদের পরামর্শে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রার্থী চূড়ান্ত করব। তাছাড়াও বিভিন্ন প্রস্তাবনা জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে আলোচনা করে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে।’

 

Read more