‘নিজের তেল নিজে জোগাড় করো’, মিত্রদের ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি

Share

ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধ আর দীর্ঘায়িত করতে চান না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে এই যুদ্ধের অবসান হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীতে জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন করতে সামরিক সহায়তা না দেওয়ায় যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো ঘনিষ্ঠ মিত্রদের কঠোর সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ওয়াশিংটন আর অন্যদের হয়ে লড়াই করবে না; প্রয়োজনে মিত্রদের ‘নিজেদের তেল নিজেদেরই জোগাড়’ করে নিতে হবে।

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ট্রাম্প এসব কথা বলেন। বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করা এই যুদ্ধ বন্ধে কোনো কূটনৈতিক চুক্তির প্রয়োজন আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ইরানের সাথে কোনো চুক্তির প্রয়োজন নেই। আমরা খুব শীঘ্রই সেখান থেকে চলে আসব… হয়তো দুই সপ্তাহ, বড়জোর তিন সপ্তাহ।”

ইরান থেকে সেনা প্রত্যাহারের শর্ত হিসেবে ট্রাম্প বলেন, “যখন আমরা বুঝব যে তাদের দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তারা আর পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হবে না, তখনই আমরা বিদায় নেব।” যদিও ইরান শুরু থেকেই দাবি করে আসছে যে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করেনি।

ইরান ইস্যুতে মার্কিন সামরিক অভিযানে সহায়তা না করায় মিত্র দেশগুলোর ওপর চটেছেন ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক পোস্টে তিনি যুক্তরাজ্যের নাম উল্লেখ করে লিখেছেন, “যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো ইরানের ‘শিরশ্ছেদ’ করার অভিযানে অংশ নিতে অস্বীকার করেছে। এখন থেকে তোমাদের নিজেদের লড়াই নিজেদেরই শিখতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র আর তোমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে না। ইরান কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে, কঠিন কাজগুলো শেষ। এখন গিয়ে নিজেদের তেল নিজেরা জোগাড় করো!”

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও ব্রিটিশ নৌবাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে টিপ্পনী কেটেছেন। তবে কাতারে সফররত ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা সচিব জন হিলি এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, যুক্তরাজ্য এখনো যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রধান মিত্র দেশ।

অন্যদিকে, ফ্রান্সের ওপর ক্ষোভ ঝেড়ে ট্রাম্প লিখেছেন, ফ্রান্স ‘খুবই অসহযোগিতা’ করছে। বিশেষ করে ইসরায়েলগামী সমরাস্ত্রবাহী মার্কিন বিমানকে নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে না দেওয়ায় তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এর জবাবে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর দফতর থেকে জানানো হয়েছে, প্রথম দিন থেকেই ফ্রান্সের অবস্থান স্পষ্ট এবং তারা তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরবে না।

কুইন্সি ইনস্টিটিউটের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ ত্রিতা পারসি ট্রাম্পের এই দুই-তিন সপ্তাহের সময়সীমাকে সতর্কতার সাথে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “প্রথমে বলা হয়েছিল যুদ্ধ ৪ দিনে শেষ হবে, তিন সপ্তাহ আগে বলা হয়েছিল আরও ৩ সপ্তাহ লাগবে। এখন আবার নতুন সময় দেওয়া হচ্ছে। আসলে এই যুদ্ধ এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।”

পারসি আরও মন্তব্য করেন যে, ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠানোর যে ঘোষণা ট্রাম্প দিয়েছেন, তা মূলত মার্কিন যুদ্ধলক্ষ্যের ‘ইসরায়েলাইজেশন’ বা ইসরায়েলি কৌশলের প্রতিফলন। তিনি একে ‘মোয়িং দ্য লন’ (ঘাস ছাঁটা) কৌশলের সাথে তুলনা করেন, যেখানে শত্রুকে নির্মূল না করে কেবল দুর্বল করে রাখা হয় যাতে কয়েক বছর পর পর আবার হামলা চালানো যায়।

ইরানের পক্ষ থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল স্থাপনায় হামলা এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম গ্যালন প্রতি ৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ট্রাম্প দাবি করছেন হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করা তার মূল লক্ষ্য নয়, কিন্তু ইউরোপীয় দেশগুলো সহায়তা না করায় তিনি দৃশ্যত হতাশ।

এদিকে, গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কর্তৃক পরোয়ানাভুক্ত ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, ইরান বিরোধী অভিযানটি লক্ষ্য অর্জনের দিক থেকে অর্ধেকের বেশি পথ পাড়ি দিয়েছে। তবে এটি শেষ হতে সুনির্দিষ্ট কতদিন লাগবে, তা বলতে রাজি হননি তিনি।

সূত্র: আল-জাজিরা

Read more