নির্বাচনের পর আজ মঙ্গলবার নতুন সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে, যখন দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত একাধিক সংকটে রয়েছে। সামনে রমজান, বাড়ছে তাপমাত্রা এবং শুরু হচ্ছে বোরোর সেচ মৌসুম। একই সঙ্গে শিল্পকারখানা ফের চালুর সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা বাড়বে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি আমদানি কিছুটা বাড়ানোয় লোডশেডিং আগের তুলনায় কম দেখা গেলেও পরিস্থিতি যে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে– তা বলা যাচ্ছে না। বিশেষ করে শিল্প খাতে গ্যাস সংকট দীর্ঘদিনের। গৃহস্থালির লাখো গ্রাহক লাইনে গ্যাস না পেলেও নিয়মিত বিল দিচ্ছেন। রান্নার গ্যাস না পেয়ে এলপিজির ওপর নির্ভরতা বাড়লেও সেই বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে নতুন সরকারের শুরুটা হতে যাচ্ছে বিদ্যুৎ-জ্বালানি ঘাটতির এক জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে।
আগামী বৃহস্পতিবার থেকে রমজান শুরুর কথা রয়েছে। শীত বিদায় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করেছে। এপ্রিল থেকে জুন– এই সময়টাই বিদ্যুতের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। এ সময়ে বোরো ধানের সেচ, গরমে শীতাতপ যন্ত্রের ব্যবহার এবং শিল্প উৎপাদন– সব মিলিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা লাফিয়ে বাড়ে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এপ্রিল-মে মাসে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। তখন প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছিল। এবার একই সময়ে চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া হলেও পরিকল্পনায় আগেভাগেই কিছু লোডশেডিং ধরে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
একই সঙ্গে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে দৈনিক ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, তারা সর্বোচ্চ ১০০ কোটি ঘনফুট দিতে পারবে। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দেওয়া হচ্ছে প্রায় ৮০ কোটি ঘনফুট। ফলে সামনের দিনগুলোতে লোডশেডিং ভোগাতে পারে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস বাড়ালে গৃহস্থালির সরবরাহ কমে যায়। এরই মধ্যে এলএনজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গতকাল রাজধানীজুড়ে গ্যাসের স্বল্পচাপ ছিল। ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরা। কোথাও চুলায় একেবারেই গ্যাস নেই, কোথাও এত কম চাপ যে, রান্না করা প্রায় অসম্ভব। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বিদ্যুৎচালিত চুলা ব্যবহার করছে, একই সংকটে পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলো। গ্যাসের চাপ কম থাকায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক চালক গ্যাস পাচ্ছেন না। এই সরবরাহ ঠিক হতে আরও দুই-তিন সময় লাগতে পারে।
ডিসেম্বর থেকে এলপিজি আমদানিতে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। নির্ধারিত এক হাজার ৩৫০ টাকার ১২ কেজির সিলিন্ডার সম্প্রতি আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। পরে দাম কিছুটা কমলেও এখনও নির্ধারিত মূল্যের ওপরে রয়েছে। সরকার জানুয়ারিতে এক লাখ ৬৭ হাজার টন এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা করেছিল। বাস্তবে এসেছে এক লাখ পাঁচ হাজার টন। ফেব্রুয়ারিতে এক লাখ ৮৪ হাজার টন আমদানির লক্ষ্য ধরা হয়েছে। তবে বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এরই মধ্যে ঝুঁকি তৈরি করেছে বিদ্যুৎকেন্দ্রর মালিকদের বকেয়া বিল। বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীরা সতর্ক করে বলছেন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছে দীর্ঘদিনের বকেয়া বিল পরিশোধ না হলে রমজান ও গ্রীষ্মে ব্যাপক লোডশেডিং অনিবার্য। তাদের হিসাবে, শুধু স্থানীয় আইপিপি মালিকদের বকেয়া প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা) গত ১০ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে জানায়, আট থেকে ১০ মাস টাকা না পেলে কোনো ব্যবসাই টিকে থাকতে পারে না। মুদ্রার দরপতন, ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তারা ইতোমধ্যেই হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এই অবস্থায় কেন্দ্র চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর ওপর বকেয়া পরিশোধ করা হচ্ছে না।
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের অর্থনীতির অধ্যাপক মুশতাক হোসাইন খান বলেন, বর্তমান সংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। গত দেড় দশকে উচ্চ ব্যয়ের বিদ্যুৎ চুক্তি, আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি ও দুর্বল জবাবদিহির ফল এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ভর্তুকি ছাড়া এই খাত চালাতে গেলে বিদ্যুতের দাম বিপুল পরিমাণে বাড়াতে হবে, যা সাধারণ মানুষ ও শিল্প– উভয়ের জন্যই বড় চাপ তৈরি করবে।
এ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু লোডশেডিং বা সাময়িক ব্যবস্থায় সমস্যার সমাধান হবে না। চুক্তি পর্যালোচনা, জ্বালানি উৎসে বৈচিত্র্য, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ড. ফাওজুল কবির খান গতকাল রাতে সমকালকে বলেন, গত বছর গ্যাস ও জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঠিক রেখে রমজান, সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি বেশ নিয়ন্ত্রণে ছিল। এবারও চাহিদা অনুসারে গ্যাস ও জ্বালানি তেলের সরবারহের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেন নতুন সরকার এসে বিরূপ পরিস্থিতিতে না পড়ে।