ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন কারাগারে থাকা কারাবন্দি ভোটাররা দ্বিতীয় দিনের মতো তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবার মোট ৫ হাজার ৯৬০ জন কারাবন্দি ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন।
কারা সূত্র জানায়, বন্দি ভোটারদের মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন উভয় শ্রেণির কয়েদি রয়েছেন। ভোটার তালিকায় নারী বন্দির পাশাপাশি ৪০০ জনের বেশি ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
সূত্রের দাবি, অধিকাংশ কারাবন্দি ভোটারের কাছে দুটি প্রতীকই বেশি পরিচিত-ধানের শীষ ও নৌকা। যেহেতু এবার নৌকা প্রতীক নেই, তাই কারাবন্দি ভোটারদের কাছে ধানের শীষই সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছে। পাশাপাশি অল্প কিছু ভোট দাঁড়িপাল্লা ও লাঙ্গল প্রতীকেও পড়েছে।
এদিকে জানা গেছে, রাজনৈতিক বন্দিদের মধ্যে ইনু–মেননসহ আনুমানিক ২২ জন ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হলেও আজ পর্যন্ত তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেননি।
শুক্রবার ভোটগ্রহণ কার্যক্রমের শেষ দিন হলেও ধারণা করা হচ্ছে, তারা আর ভোট দিতে ইচ্ছুক নন।
বৃহস্পতিবার কারাগারের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, কেরানীগঞ্জ বিশেষ কেন্দ্রীয় কারাগারে মোট ১০২ জন নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে এ পর্যন্ত ভোট প্রদান করেছেন ৩৯ জন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি ও ১২ জন হাজতি।
সূত্র জানায়, আওয়ামী ফ্যাসিবাদ ও তাদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত যেসব রাজনৈতিক ব্যক্তি বর্তমানে কারাবন্দি রয়েছেন, তারা ভোটার হলেও এখনো পর্যন্ত ভোটাধিকার প্রয়োগ করেননি। এদের মধ্যে ইনু ও মেননসহ আরও কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তি রয়েছেন।
অন্যদিকে, ছাত্র–জনতার আন্দোলন বিরোধিতার অভিযোগে বন্দি কিছু পুলিশ কর্মকর্তা ও সাবেক সচিব ইতোমধ্যে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন বলে কারা সূত্র নিশ্চিত করেছে।
কারা সূত্রে আরও জানা যায়, বন্দি ভোটারদের একটি বড় অংশ জীবনে প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। কারাগারের ভেতরেই নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে এবং শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলমান থাকবে।
কারা সূত্র দাবি করে, বন্দি ভোটারদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটারের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে ধানের শীষ প্রতীক। যদিও এটি কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব নয়।
কারাগারে বন্দিরা বিভিন্ন স্থানে কাজ করার সময় নিজেদের মধ্যে কাকে ভোট দেওয়া যায়, সে বিষয়ে আলোচনা করেন। সেই আলোচনাতেই ধানের শীষের আধিক্য ফুটে ওঠে। হাজতি বন্দিদের মাঝেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
সূত্র একটি উদাহরণ দিয়ে জানায়, একজন কয়েদি জীবনে প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। তিনি আরেকজন কয়েদির সঙ্গে ভোট নিয়ে আলোচনা করেন। একপর্যায়ে শোনা যায়, দুজনই ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কথা বলছেন। তবে সীমিত সংখ্যক বন্দি ভোটার জামায়াত বা জাতীয় পার্টির দিকেও যেতে পারেন। নতুন দল এনসিপি বন্দিদের মাঝে প্রায় অচেনা বললেই চলে।
গণঅভ্যুত্থানের পর ফ্যাসিবাদের প্রতিহিংসায় দায়ের করা ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় কারাগারে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক বন্দি আইনগত প্রক্রিয়ায় মুক্তি পান। এদের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর হাজার হাজার নেতাকর্মী ছিলেন। সে কারণে বর্তমানে কারাগারে এসব দলের নেতাকর্মীর উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম। ফলে অধিকাংশ কারাবন্দি ভোটার নিজেদের আলোচনায় ধানের শীষ প্রতীকের কথাই বেশি বলেন। কারাগারের ভেতরে দায়িত্বে থাকা কারারক্ষীরা এসব আলোচনা শুনতে পান।
কারা সূত্র আরও জানায়, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিরোধিতাকারী আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী ও তাদের সহযোগী ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এসব বন্দিকে আলাদাভাবে কেরানীগঞ্জ বিশেষ কারাগারে রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে সূত্রটি মন্তব্য করে বলে, গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে তাদের ভোট যাওয়ার সম্ভাবনা কম-এ কথা দেশের সবাই স্বীকার করবে। তবে তারা কাকে ভোট দেবেন, তা তারাই ভালো জানেন। আবার হাস্যরস করে সূত্রটি বলেন, তারা ভোট না দিয়ে ব্যালট পেপারে নিজেদের দুঃখ-কষ্টের কথা লিখে রাখেন কি না, তা মহান আল্লাহই ভালো জানেন।
বৃহস্পতিবার ঢাকার বকশিবাজারে কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি–মিডিয়া) জান্নাত-উল ফরহাদ বলেন, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী কারাবন্দি ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। এই ভোটগ্রহণ কার্যক্রম ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানান, প্রস্তাবনার মাধ্যমে কারাবন্দিদের ইচ্ছা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের অ্যাপে ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করা হয়। পরে যাচাই-বাছাই শেষে নির্বাচন কমিশন ৫ হাজার ৯৬০ জন কারাবন্দিকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।