প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে অবাস্তব ও বাস্তবায়ন অযোগ্য আখ্যা দিয়েছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। বাজেটের বিশাল আকার ও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এক লাখ ৭৬ হাজার টাকা বেতনে মফিজ নামের এক ব্যক্তির ঢাকা শহরে ৩ একর জায়গায় সুইমিংপুলসহ বাড়ি করার স্বপ্নের মতোই এই বাজেট।
’
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয় উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে এনবিআরের ঘাড়ে চাপানো হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এপ্রিল পর্যন্ত এনবিআর ৩ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি আদায় করতে পারেনি।
সেই এনবিআর কী করে ৬ লাখ কোটি টাকা আদায় করবে, তা আমার মাথায় ঢোকে না।’
রাজস্ব আদায় ব্যর্থ হলে ব্যাংক ও বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়বে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিলে ব্যক্তি খাতে ঋণ কমে যাবে।
দেশে এখন গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও উচ্চ সুদের কারণে বিনিয়োগে চরম মন্দা চলছে। ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে ১৯০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮তম। বিনিয়োগ না থাকলে কর্মসংস্থান হবে না, যে কারণে আমাদের প্রবৃদ্ধিকে ‘জবলেস গ্রোথ’ (কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি) বলা হয়।’
ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘সংসদে দাঁড়িয়ে বলতে হচ্ছে দেশে মন্দ ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে অবলোপন, পুনঃতফসিল ও মামলার কারণে আটকে থাকা টাকা যোগ করলে মোট পরিমাণ দাঁড়াবে ১১ লাখ কোটি টাকা; যা মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ। এই অবস্থায় ব্যাংকগুলো সরকারকে কীভাবে সহায়তা দেবে?’
বৈদেশিক ঋণের প্রসঙ্গ টেনে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১৩৩ বিলিয়ন ডলার। বাজেটের ১৩.৫৯ শতাংশই রাখা হয়েছে সুদ পরিশোধের জন্য। আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক ঋণ দিলে শর্ত কঠিন হলেও সুদ কম থাকে, কিন্তু চীন বা অন্যান্য দেশ থেকে ঋণ নিলে উচ্চ সুদে দ্রুত পরিশোধের চাপ থাকে। ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা কতটুকু উপযোগী, তা ভেবে দেখতে হবে।’
১০ শতাংশ মূল্যস্ফীতির দেশে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘মাসে ৩২ হাজার টাকা আয় করা ব্যক্তিকে কোনোভাবেই মধ্যবিত্ত বলা যায় না। দেশে এখন গিনি সহগ ০.৪৯৯, যা উচ্চ আয় বৈষম্য নির্দেশ করে। মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশ মাত্র ১০ শতাংশ মানুষের হাতে। অথচ করের বোঝা চাপানো হচ্ছে চাকরিজীবীদের ওপর। পরোক্ষ করের মাধ্যমে ধনী-গরিব সবার ওপর সমান চাপ দেওয়া ন্যায্যতার পরিপন্থী।’
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দের চরম অপ্রতুলতার কথা উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ০.৯ শতাংশ এবং শিক্ষায় ১.৮ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে স্বাস্থ্য খাতে এটি ৫ শতাংশ হওয়া উচিত। সরকারি বরাদ্দ কম থাকায় চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতি বছর ৬৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে।’
শিক্ষাক্ষেত্রে তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক করার আগে শিক্ষার্থীদের রিডিং পড়া ও বেসিক ইংরেজি শেখার ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবে স্পিকারের কাছে বাড়তি ২ মিনিট সময় চেয়ে নিজ নির্বাচনী এলাকার সমস্যার কথা তুলে ধরেন রুমিন ফারহানা। তিনি তার এলাকার ১৯টি ইউনিয়নের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো সচল করা, ওষুধ নিশ্চিত করা এবং বেহাল রাস্তাঘাট সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।