শেষ মুহূর্তে এসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর বোমা হামলা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করতে সম্মত হয়েছেন। এর আগে তিনি হুমকি দিয়েছিলেন, তেহরান দাবি না মানলে আজ রাতে ‘একটি গোটা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে।
’
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় যখন হামলা শুরু হতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি, তখন ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানান।
তিনি এই সমঝোতার মধ্যস্থতা করার জন্য পাকিস্তানকে কৃতিত্ব দিয়েছেন।
তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত কিছু শর্তসাপেক্ষে নেওয়া হয়েছে– যার মধ্যে প্রধান হলো ইরানকে অবশ্যই হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিতে হবে।
ট্রাম্প লিখেছেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ ও ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে আলোচনায় তারা অনুরোধ করেছেন, আমি যেন আজ রাতে ইরানের দিকে পাঠানো ধ্বংসাত্মক হামলা থামিয়ে দিই।
ইরান যদি সম্পূর্ণভাবে, অবিলম্বে এবং নিরাপদভাবে হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে রাজি হয়, তবে আমি দুই সপ্তাহের জন্য ইরানে বোমা হামলা ও আক্রমণ স্থগিত করতে রাজি আছি।
যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় সন্ধ্যা ৬:৩২ মিনিটে (২২:৩২ জিএমটি) এ বার্তাটি পোস্ট করা হয়।
ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া হামলার সময়সীমা রাত ৮টার (০০:০০ জিএমটি) মাত্র দেড় ঘণ্টা আগে এ ঘোষণা আসে।
ট্রাম্পের বার্তার কিছুক্ষণ পরেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি নিশ্চিত করেছেন, একটি সাময়িক চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
আরাগচি লিখেছেন, ইরানের ওপর হামলা বন্ধ হলে আমাদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীও তাদের প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রম বন্ধ রাখবে।
তিনি আরও জানান, ‘আগামী দুই সপ্তাহের জন্য ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখে হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত সম্ভব হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলা স্থগিত করার শেষ মুহূর্তের আবেদনের জন্য আরাগচিও পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
এদিকে, ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল আলাদা বিবৃতিতে ইঙ্গিত দিয়েছে, আলোচনা ইতিবাচকভাবে চললে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ দুই সপ্তাহের বেশি বাড়ানো হতে পারে।
আগামী সপ্তাহগুলোতে ইসলামাবাদে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েরের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই ইরান হরমুজ প্রণালীতে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। নিজ দেশেও ট্রাম্প তার রক্ষণশীল সমর্থকদের সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প নেটো সদস্য এবং জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো প্রধান মার্কিন মিত্রদের ওপর এই যুদ্ধে যোগ দিতে এবং প্রণালীটি খুলে দেওয়ার জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন।
তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে ‘অনেক দেশ’ যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে কিন্তু প্রতিরক্ষামূলক মহড়া ছাড়া কোনো দেশই তেমন কিছু করেনি।
মার্চের শেষ দিক থেকে ট্রাম্প হুমকি দিতে শুরু করেন, প্রণালীটি খুলে না দিলে তিনি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করে দেবেন।
কিন্তু প্রতিবারই তিনি তার পরিকল্পিত হামলার তারিখ পিছিয়ে দিয়েছেন। ২৩ মার্চ আলোচনার অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে তিনি পাঁচ দিনের জন্য হামলা স্থগিত করেন। এরপর ২৬ মার্চ সেই সময়সীমা ঘনিয়ে এলে তিনি পুনরায় এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত তা পিছিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মঙ্গলবারের এই দুই সপ্তাহের স্থগিতাদেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলছে, যার মধ্যে রয়েছে ইসরায়েল ট্রাম্পের এই যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে কি না।
আল জাজিরা বলছে, সাধারণত ইসরায়েল ট্রাম্প প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণ করে আসছে, যদিও অনেকে মনে করেন যে ইসরায়েলের জোরাজুরিতেই তিনি যুদ্ধে জড়িয়েছেন।
অতীতে একই ধরনের চুক্তি ভঙ্গ করার নজির থাকায় ইসরায়েল লেবাননে হিজবুল্লাহ ও ইরানের অন্যান্য আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর হামলা বন্ধ করবে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়ে গেছে।
কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্র্যাফটের ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পার্সি বলেন, এই অঞ্চলে ইসরায়েলের আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অবশ্যই সম্ভব, তবে এটি ট্রাম্প এবং তার রিপাবলিকান মিত্রদের জন্য রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।
পার্সি বলেন, আমরা এখনো ট্রাম্পকে ইসরায়েলিদের ওপর সেই চাপ বজায় রাখতে সক্ষম হতে দেখিনি।
তবুও পার্সি ব্যাখ্যা করেন, ইসরায়েল হয়ত ট্রাম্পের ইচ্ছার অবাধ্য হওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইবে না, কারণ সেক্ষেত্রে তাদের একা ইরানের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
তিনি বলেন, আমি মনে করি না যে আমেরিকানদের সক্রিয় সমর্থন ছাড়া ইসরায়েলিরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে টিকে থাকতে পারবে। আর তারা যদি আমেরিকার ইচ্ছার বিরুদ্ধে এটি করে, তবে তারা একটি বিশাল ঝুঁকি নেবে– সম্ভবত তখন যুক্তরাষ্ট্র সেই যুদ্ধ থেকে দূরে থাকবে।
পার্সি আরও যোগ করেন, ইসরায়েলিরা একা ইরানের মুখোমুখি হচ্ছে– এমন পরিস্থিতিতে তারা কখনোই পড়তে চাইবে না।
সূত্র: আল জাজিরা