নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে ভর্তুকি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিসহ নানা পদক্ষেপের কথা চিন্তা করছে সরকার। একই সঙ্গে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে আরও এলএনজি আমদানির কথা ভাবা হচ্ছে। এজন্য দ্রুত আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল-এফএসআরইউ বসানোর জন্য বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রাধান্য খাত হিসাবে ১৮০ দিনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে গতি আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
জানা যায়, ১৮০ দিনে কী কী সিদ্ধান্ত বা কাজ করা যেতে পারে, তা নিয়ে বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সভাপতিত্বে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সচিব উপস্থিতি ছিলেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার রাতে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, এ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হচ্ছে। আশা করছি, আগামী সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা দেওয়া হবে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ব্যাপারে তিনি বলেন, এ নিয়ে মন্ত্রণালয় কাজ করছে। এখনো কিছু বলার সময় আসেনি।
বিদ্যুৎ বিভাগ বৃহস্পতিবার এক পেপার উপস্থাপন করে জানিয়েছে, তারা বিএনপি সরকারের ইশতেহার অনুযায়ী বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ওই বৈঠকে জানানো হয়, দেশে এখন বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে ১৩৫টি। বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ৩২ হাজার ৩২২ মেগাওয়াট। এ বছর চাহিদা হতে পারে ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। প্রতিবছর বিদ্যুতের এ চাহিদা ১ হাজার মেগাওয়াট করে বাড়ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বাড়ানো।
একই সঙ্গে বিদ্যুতের দামের সমন্বয় অর্থাৎ দাম বৃদ্ধি। কারণ, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবি জানিয়েছে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সরবরাহ করতে পিডিবির খরচ পড়ে ১২ টাকা ৩৫ পয়সা। কিন্তু বিক্রি করা হচ্ছে ৬ টাকা ৬৩ পয়সা। গত অর্থবছরে পিডিবি বিদ্যুৎ বিক্রি করে ৫৫ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। এর মধ্যে সরকার ৩৯ হাজার কোটি লোকসান দেওয়ার পরও পিডিবির লোকসান ১৬ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে আগের বছরের লোকসানসহ পিডিবির কাছে এখন বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কোম্পানির পাওনা ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। আগামী দিনে এ লোকসান বাড়বে। এক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, ২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষতা বাড়িয়ে ২০ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয়, টেকসই এবং সাশ্রয়ী ইমারত নির্মাণকে উৎসাহিত করতে গ্রিন বিল্ডিং সার্টিফিকেশন প্রচলন করা। যাতে বিদ্যুতের সাশ্রয় হয়। এতে আরও বলা হয়, বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ১ হাজার ৬৮৯ মেগাওয়াট।
নির্বাচনি ইশতেহারে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উৎসাহিত করা হয়েছে। তাই জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের সব সরকারি অফিস, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাদে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল বসাতে পারলে কমপক্ষে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
জ্বালানি বিভাগ তার ১৮০ দিনের কর্মপন্থায় বলেছে, দেশে এখন ৩৮০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাসের চাহিদা আছে। কিন্তু সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে ২৭০ কোটি ঘনফুটের কম। যার মধ্যে আবার আমদানি করা গ্যাস (এলএনজি) ৯৫ কোটি ঘনফুট। গ্যাস খাতের অবস্থা একেবারে করুণ।
কারণ, প্রতিদিন ৫ লাখ ঘনফুট করে গ্যাসের উৎপাদন কমছে দেশীয় ক্ষেত্রগুলোয়। এখন গ্যাসের চাহিদা মেটাতে প্রতিবছর ৪৬ হাজার ৫২৪ কোটি টাকার বেশি এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। বেশি দামে গ্যাস আমদানির কারণে গত অর্থবছরে ভতুর্কি দিতে হয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা। এখন আইএমএফ-এর শর্ত অনুযায়ী জ্বালানি খাত থেকে ভতুর্কি তুলে দিতে হলে গ্যাসের দাম বাড়াতে হবে। এমন প্রেক্ষাপটে দেশে নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করতে নতুন করে কূপ খনন করতে হবে।
তাই ১৮০ দিনে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ভূমিতে (অনশোরে) ২১টি এবং সমুদ্রে (অফশোরে) ২৬টি ব্লক বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকার পৃথক দুটি উৎপাদন বণ্টন চুক্তি-পিএসসি খসড়া করে গেছে।
এছাড়া গ্যাসের তীব্র সংকট দূর করতে শিগ্গিরই আরও একটি এফএসআরইউ বসিয়ে এলএনজি আমদানি করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে সৌদি সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের একটি চুক্তি হলে ওই দেশের কোম্পানি সৌদি আরএমকো মহেশখালীতে একটি এফএসআরইউ করতে আগ্রহী। তৃতীয় আরও একটি এফএসআরইউ হলে দৈনিক আরও ৫৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস ২ বছরে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব।
এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে করা মহেশখালী থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত সমুদ্র তলদেশ দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহণে পাইপলাইন বসানোর জন্য সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং নামে একটি প্রকল্প বাস্তাবায়ন করা হয়েছে। সেটি পরিচালনার জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে। সেই টেন্ডারে যোগ্য দরদাতাকে কাজ দেওয়া যেতে পারে। যাতে ১৮০ দিনে ওই প্রকল্প চালু করা যায়। এছাড়া গ্যাস চুরি কমানোর জন্য নানা সুপারিশ করেছে জ্বালানি বিভাগ।