দেশে প্রতি বছর ১ লাখ ৬৭ হাজার মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হয় এবং মারা যায় প্রায় ১ লাখ সাড়ে ১৬ হাজার রোগী। বেশিরভাগ ক্যানসার রোগীর চিকিৎসা নেওয়ার আর্থিক সক্ষমতা থাকে না। ফলে অনেক ক্যানসার রোগীই বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। এমন বাস্তবতায় ব্যয়বহুল ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে অসচ্ছল রোগীদের জন্য বিকল্প অর্থায়নের জোর তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
ক্যানসারের মতো জটিল রোগের দীর্ঘ চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে বেশিরভাগ পরিবারই তাদের সঞ্চিত অর্থ শেষ করে ফেলতে হয়। আবার অনেকেই বাড়িঘর, সম্পত্তি বিক্রি এবং ঋণ করতে বাধ্য হয়। ক্যানসার চিকিৎসায় অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট পরিচালিত আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী জার্নাল অব ক্যানসার পলিসি-তে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে স্তন, জরায়ুমুখ ও মুখগহ্বর ক্যানসারের অর্থনৈতিক বোঝা’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণা থেকে জানা যায়, দেশে একজন ক্যানসার রোগীর গড়ে ১২ হাজার ১১৭ মার্কিন ডলার খরচ হচ্ছে। এই খরচ অধিকাংশ পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের অনেক গুণ। এতে সর্বস্বান্ত হচ্ছে বেশিরভাগ রোগীর পরিবার।
গবেষণায় স্তন, জরায়ুমুখ ও মুখগহ্বর ক্যানসারে আক্রান্ত ৩৪৬ রোগী ও তাদের পরিবারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
অংশগ্রহণকারী প্রায় ৩৯ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ছিল ২০ হাজার টাকার নিচে। ১১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তাদের মাসিক আয় ৫০ হাজার টাকার বেশি। রোগীর মধ্যে ৯৬ দশমিক ৮ শতাংশ বিবাহিত। অধিকাংশ রোগী ঢাকা (৪৬ দশমিক ৮ শতাংশ), চট্টগ্রাম (২২ শতাংশ) ও রাজশাহী (১৬ দশমিক ২ শতাংশ) বিভাগে বাস করেন।
কোন খাতে কত খরচ
গবেষণায় দেখা গেছে, সরাসরি চিকিৎসা ব্যয়-যেমন চিকিৎসক ফি, ওষুধ ও পরীক্ষা-গড়ে চার হাজার ৩৮৭ ডলার, যা মোট ব্যয়ের ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ।
নন-মেডিকেল খরচ (যাতায়াত, খাবার ও হাসপাতালে থাকা) গড়ে ৪৭২ ডলার। এ ছাড়া রোগী ও তাদের সঙ্গীর আয়হানির মতো পরোক্ষ ব্যয় গড়ে এক হাজার ৮৭৫ ডলার, যা মোট ব্যয়ের ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রয়েছে অদৃশ্য ব্যয়-মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও সামাজিক ভোগান্তি-যার পরিমাণ গড়ে পাঁচ হাজার ৩৮৩ ডলার, অর্থাৎ মোট খরচের ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
অপরদিকে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা থেকে জানা যায়, দেশে ক্যানসারে আক্রান্ত একজন রোগীর চিকিৎসায় গড়ে ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৮৪০ টাকা খরচ হয়। এই খরচ সর্বনিম্ন ৮১ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় ওষুধপত্রের জন্য।
ক্যানসারের প্রথম স্তরে গড়ে চিকিৎসা খরচ প্রায় ৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা। দ্বিতীয় স্তরে এই খরচ বেড়ে প্রায় ৭ লাখ টাকায় পৌঁছায়। এই ব্যয় মেটাতে প্রায় ৭৮ শতাংশ পরিবারকে ঋণ করতে হয়। ৬৫ শতাংশ পরিবার নিয়মিত আয় থেকে খরচ বহন করে। ৫৬ শতাংশ পরিবার সঞ্চয় ভাঙে। ৪০ শতাংশ পরিবার সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩২ ধরনের ক্যানসার রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। দেশে দৈনিক গড়ে ৪৫৮ জন ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন, প্রতিদিন গড়ে মারা যাচ্ছেন ৩১৯ জন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য একটি করে ক্যানসার সেন্টার প্রয়োজন। সে হিসাবে বাংলাদেশে অন্তত ১৭০টি ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র থাকা দরকার, তবে বর্তমানে আছে মাত্র ২২টি, যার বেশিরভাগই ঢাকায়।
সরকারি পর্যায়ে ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ খুবই সীমিত। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পেতে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করতে হয়। ফলে অনেকের চিকিৎসায় ভাটা পড়ে। নিম্নবিত্ত অনেক পরিবার উপায়ন্তর না দেখে মাঝপথেই চিকিৎসা বন্ধ করে দেয়।
বেসরকারি হাসপাতালে ক্যানসার চিকিৎসায় উচ্চ ব্যয়ের প্রধান খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে কেমোথেরাপি, সার্জারি, রেডিওথেরাপি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ফি এবং বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও হাসপাতালে থাকার খরচ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে নাগরিকদের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় কোনো স্বাস্থ্যবিমা নেই। দাতব্য কর্মসূচিও তেমন একটা নেই। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় দরিদ্র রোগীদের ৫০ হাজার টাকা দেয়, যা ক্যানসার চিকিৎসায় যৎসামান্য। ব্যয়বহুল ক্যানসারের চিকিৎসা সরকারের একার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। সরকারি উদ্যোগে বিকল্প অর্থায়ন করা গেলে নিম্ন আয়ের মানুষগুলো ক্যানসারের চিকিৎসা পেত এবং বহু জীবন বেঁচে যেত।
৩২–৩৩ বছরের রিনা আক্তার আট বছরের ছেলের ক্যানসারের চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন। চাকরিজীবী একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামীর হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয়। স্বামী হারানোর শোক সামলানোর আগেই অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসার ভার এসে পড়ে তার কাঁধে। একের পর এক হাসপাতাল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের খরচ চালাতে গিয়ে তিনি এখন চরম দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপে দিন কাটাচ্ছেন। সীমিত আয়ের এই পরিবারে সন্তানের জীবন বাঁচাতে প্রতিদিনই লড়াই করতে হচ্ছে তাকে।
ক্যানসার রোগীর চিকিৎসায় বিকল্প অর্থায়ন প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, প্রথমে ক্যানসার যেন না হয়, সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিরোধ এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। এরপরেও ক্যানসার হলে তার চিকিৎসায় ব্যয় সরকার কিংবা ইনস্যুরেন্স কোম্পানি বা ব্যক্তি-কাউকে না কাউকে বহন করতে হয়। ক্যানসার চিকিৎসায় গড়ে ৭/৮ লাখ টাকা খরচ হয়, আবার কোনো কোনো ক্যানসার চিকিৎসায় কোটি টাকাও ব্যয় হয়। এই টাকা ধনী, শিল্পপতি ছাড়া কোনো পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। সরকারের প্রচলিত ফাইন্যান্স থেকেও এটা বহন করা সম্ভব না। তাহলে এই টাকা বহন করবে কে? এজন্য আমাদের বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।
বিকল্প অর্থায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের দেশে বর্তমানে প্রায় ২০ কোটি মোবাইল ব্যবহারকারী আছে। প্রতিদিন এক টাকা দিতে পারবে না-এমন মানুষ দেশে নেই। এই ২০ কোটি মোবাইল ব্যবহারকারীর কাছ থেকে প্রতিদিন যদি এক টাকা করে নেওয়া হয়, তাহলে বছরে এখান থেকে প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা অর্জন করা সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপক আরও বলেন, আমরা বাৎসরিক তামাকজাত পণ্যের কর পাই প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। তামাকের কর আরও ১০ শতাংশ বাড়িয়ে দিলে বাড়তি আরও তিন হাজার কোটি টাকা আসবে। এর সঙ্গে সরকার যদি আড়াই হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়, তাহলে ১২/১৩ হাজার কোটি টাকার ফান্ড হয়ে যায়। এই ফান্ড থেকে যারা দেশের ভেতরে ক্যানসারসহ অন্যান্য জটিল ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসা নিচ্ছে, তাদের চার-পাঁচ লাখ টাকা অনায়াসেই সহযোগিতা করা যায়। এটাকে আমরা ন্যাশনাল হেলথ ফান্ড বলতে পারি।
এর সঙ্গে সুইট ও বেভারেজজাত পণ্য-যেগুলো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর-সেসব পণ্যের ওপরও ট্যাক্স বাড়িয়ে বাড়তি ট্যাক্সের টাকা এই ফান্ডে দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি আরেকটি উৎস আছে-করপোরেট সিএসআর মানি। বিভিন্ন বড় বড় প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো করে সিএসআর কার্যক্রম পরিচালনা করে। কোম্পানিগুলোর সিএসআর ফান্ডের ১০/২০ শতাংশ সরকারের স্বাস্থ্য ফান্ডে দেওয়া যেতে পারে, বাকিটা তারা খরচ করবে-এমন নিয়ম করা যেতে পারে। এভাবে আমরা বিভিন্ন উপায়ে বিকল্প অর্থায়নের মাধ্যমে বছরে যদি ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা ফান্ড সংগ্রহ করতে পারি, সেই টাকা দিয়ে ক্যানসার এবং অন্যান্য ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ বহন করা যেতে পারে।